সোনাম ওয়াংচুকের অনশন: এক ব্যক্তির লড়াই, নাকি ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের প্রতিচ্ছবি?

৪৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

যখন গোটা বিশ্বের মতো ভারতের অসংখ্য মানুষও ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায় মগ্ন, তখন দেশের রাজধানী দিল্লির যন্তর-মন্তরে নীরবে চলছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সেখানে দীর্ঘ অনশনে বসেছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ ও শিক্ষাসংস্কারক সোনাম ওয়াংচুক। তাঁর এই আন্দোলন ব্যক্তিগত কোনও স্বার্থে নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে।

সোনাম ওয়াংচুকের দাবি ছিল, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, মূল্যায়নে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির প্রতিবাদেই তিনি নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে রেখে অনশন শুরু করেন।

লাদাখের বাসিন্দা ওয়াংচুক কেবল একজন প্রকৌশলী নন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, পরিবেশ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সংরক্ষণে কাজ করে আসছেন। তাঁর প্রচেষ্টায় লাদাখে এমন এক শিক্ষার ধারণা গড়ে ওঠে, যেখানে আধুনিক জ্ঞানের পাশাপাশি স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর মতে, দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা আলাদা। তাই সবার জন্য একই ধরনের শিক্ষা কার্যকর হতে পারে না।

এই ভাবনার জন্যই তিনি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছেন। তাঁর জীবন ও কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্র থ্রি ইডিয়টস-এর প্রধান চরিত্রের ধারণা তৈরি হয়েছিল, যা তাঁকে আরও পরিচিত করে তোলে।

শিক্ষাক্ষেত্রের বাইরে পরিবেশ রক্ষাতেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। হিমালয়ের নাজুক পরিবেশ এবং লাদাখের প্রাকৃতিক সম্পদকে নির্বিচারে বাণিজ্যিক ব্যবহারের হাত থেকে রক্ষার জন্য তিনি দীর্ঘদিন আন্দোলন করে আসছেন। উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ক্ষতি হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তার মূল্য দিতে হবে, এই বিশ্বাস থেকেই তিনি কর্পোরেট স্বার্থের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।

বর্তমান অনশনের অন্যতম কারণ ছিল সাম্প্রতিক শিক্ষা-সংক্রান্ত বিতর্ক। বিশেষ করে মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এ প্রশ্নফাঁস এবং বিভিন্ন পরীক্ষায় মূল্যায়ন সংক্রান্ত অভিযোগ দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি করে। বহু পরীক্ষার্থী বছরের পর বছর পরিশ্রম করার পরও অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এই পরিস্থিতির দায় স্বীকার করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তোলেন ওয়াংচুক।

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনশন নতুন কোনও বিষয় নয়। মহাত্মা গান্ধি থেকে শুরু করে ইরম শর্মিলা পর্যন্ত অনেকেই অহিংস প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে অনশনকে বেছে নিয়েছেন। যদিও এই পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবু যখন সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত হয়, তখন অনশন অনেক সময় জনমত গড়ে তোলার শক্তিশালী উপায় হয়ে ওঠে।

সোনাম ওয়াংচুকের দীর্ঘ অনশনের ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে দেশ-বিদেশে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর আন্দোলন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয়টিকে নতুন করে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসে। অনেকের বিশ্বাস, এই চাপ সরকারের নীতিনির্ধারণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক অনশনই শেষ পর্যন্ত পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। মহাত্মা গান্ধির বিভিন্ন অনশন তার অন্যতম উদাহরণ। তাই আশা করা যায়, সোনাম ওয়াংচুকের আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এমন একটি সমাধান আসবে, যেখানে তাঁর জীবন সুরক্ষিত থাকবে এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের দিকেও সরকার গুরুত্ব দেবে।

একজন নাগরিক হিসেবে সোনাম ওয়াংচুকের জীবন যেমন মূল্যবান, তেমনি মূল্যবান দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্নেই তাঁর এই প্রতিবাদ ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.