কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের নাগরিকত্ব যাচাই ও হয়রানির সংকট, ভাষার বুলডোজার! বাংলা থেকে আমেরিকান ক্যাপিটালিজম: সিয়ারসাকারের দাসত্ব ও আভিজাত্যের ইতিহাস অবৈধ মাইনিং এবং পরিবেশ উদাসীনতায় ডুবছে আসাম বালাঘাটে শিশুমৃত্যু,স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা ও বৈগা আদিবাসী সংকট এক বছরের মধ্যে, RSS পরিচালিত ১০০০টি স্কুল খোলার লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী : শিক্ষার গেরুয়াকরণ? মনসুন ওয়েডিং: এক পশলা বৃষ্টিতে ধোয়া সম্পর্কের হিসেব অনুদান কোটি কোটি, প্রার্থী মোটে ১৫! গুজরাটের বেনামী দলগুলোর আড়ালে কি বিশাল কর ফাঁকির খেলা? নেপালে ফের বিপর্যয়ের আশঙ্কা : ধারচুলায় ধসে আটকে গেল নদীর গতিপথ

কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের নাগরিকত্ব যাচাই ও হয়রানির সংকট, ভাষার বুলডোজার!

২৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​ভারতবর্ষের মানচিত্রে পরিযায়ী শ্রম এক চিরন্তন ও করুণ উপাখ্যান। পেটের দায়ে ভিটেমাটি ছেড়ে ভিন রাজ্যে পাড়ি জমানো কোটি কোটি খেটে খাওয়া মানুষ এই দেশের অর্থনীতির অদৃশ্য চালিকাশক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যা ঘটছে, তা এক গভীর রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। কংগ্রেস-শাসিত কর্ণাটকে বাঙালি মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের নাগরিকত্ব নিয়ে যে আকস্মিক ও কঠোর যাচাই-অভিযান শুরু হয়েছে, তা কেবল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি রাজনৈতিক সমীকরণের এক অন্য দিক৷



​উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া কিংবা মুর্শিদাবাদের ধুলোমাখা পথ ছেড়ে যে মানুষগুলো বেঙ্গালুরুর আবর্জনা পরিষ্কার করে, নির্মাণশ্রমিক বা রিকশাচালক হিসেবে ঘাম ঝরায়, তারা কখনো ভাবেনি তাদের মুখের বাংলা ভাষা একদিন তাদের অপরাধের তকমা হয়ে দাঁড়াবে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, তথাকথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্তের নামে চলা অভিযানে হাজার হাজার বাঙালি শ্রমিককে সন্দেহের জাঁতাকলে পিষে ফেলা হয়েছে। অথচ তথ্য বলছে, তল্লাশি চালানো স্থানগুলোতে আটকদের একটি বড় অংশই পশ্চিমবঙ্গের বৈধ ভারতীয় নাগরিক। রফিকুল বিশ্বাস কিংবা শেখ কাদেরের মতো শত শত মানুষের জীবন আজ এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে, যেখানে তাঁদের জন্মভিটের দলিলপত্র, আধার কার্ড কিংবা ভোটার পরিচয়পত্রও যেন সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠতে পারছে না।


​ভাষা এবং ধর্মের মিল যখন রাষ্ট্রীয় সন্দেহের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন সংবিধানের দেওয়া মৌলিক অধিকার এক অর্থহীন কাগজে পরিণত হয়। যে রাজ্যে প্রগতিশীল রাজনীতির দাবি করা সরকার ক্ষমতায়, সেখানেও দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক বয়ানের এই অন্ধ অনুকরণ এক বিপজ্জনক নজির স্থাপন করছে।

কর্ণাটকে নাগরিকত্ব হয়রানির শিকার বাংলার মুসলিম মহিলা

​রাজনীতির ময়দানে আদর্শগত বিরোধ যতই তীব্র হোক না কেন, প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে কর্ণাটকের কংগ্রেস সরকারের এই কড়াকড়ি এক গভীর দ্বিচারিতার মুখোশ উন্মোচন করে। দীর্ঘদিন ধরে ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ‘অনুপ্রবেশকারী’ বনাম ‘নাগরিক’-এর যে মেরুকরণের রাজনীতি করে আসছে, তা আজ প্রশাসনিক ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। বেঙ্গালুরু পুলিশ যখন হাজার হাজার মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে যাচাইয়ের নামের আড়ালে হেনস্তা করে, তখন তা আইন-শৃঙ্খলার চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে সংখ্যাগুরু তোষণ ও মেরুকরণের এক নীরব রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ। স্থানীয় সমাজকর্মী ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, প্রকৃত অনুপ্রবেশকারীদের ছাঁটাইয়ের নামে একটি নির্দিষ্ট ভাষিক ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে সমষ্টিগতভাবে ‘সন্দেহভাজন শ্রেণি’ (Suspect Class)-এ পরিণত করা হয়েছে।

​নাগরিকত্ব প্রমাণের এই নিষ্ঠুর অগ্নিপরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হচ্ছে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষেরা। রফিকুল বিশ্বাসের মতো বহু মানুষ মাসের পর মাস ডিটেনশন সেন্টারে কাটিয়েছেন, যাঁদের সামান্য আয়ে সংসার চলে, তাঁরা আজ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর মতো ঘটনাগুলো কেবল ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, এটি আমাদের সমষ্টিগত ব্যবস্থার চরম নৈতিক পরাজয়। আইন ও সংবিধান যেখানে প্রত্যেক নাগরিককে সুরক্ষার ওয়াদা দেয়, সেখানে রাষ্ট্রের নির্বিকার ভূমিকা প্রমাণ করে যে, দরিদ্র মানুষের জন্য নাগরিকত্ব কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়, বরং এক নিত্যদিনের যুদ্ধ।


​ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিযায়ী শ্রম আজ এক গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার। কর্ণাটকের এই সাম্প্রতিক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অসহিষ্ণুতার মূল কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে। বাঙালি মুসলিম শ্রমিকদের ওপর এই নাগরিকত্ব স্ক্রুটিনি কেবল কর্ণাটকের নয়, সমগ্র ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর এক কঠিন পরীক্ষা। যদি এই প্রবণতা রোধ করা না যায়, তবে পরিযায়ী মানুষের ঘামে গড়া এই দেশের ভিত্তিপ্রস্তরই একদিন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.