“ওরা যত বেশি পড়ে কত কম মানে”- আর হিরকরাজার মতোই শাসকের রং পাল্টায় কিন্তু মানুষের দিন পাল্টায় নাহ্৷ বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে গোটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটি কোনো গোপন বিষয় নয়। খবরের কাগজ খুললেই দেখা যায়, কোথাও ছাদহীন ভাঙা স্কুলঘর, কোথাও আবার বটগাছের ঝুরি আঁকড়ে পড়ে থাকা মিড-ডে মিলের রান্নার হাঁড়ি। অথচ এই ভারতবর্ষেরই অন্য পিঠে আলোর রোশনাই কম নয়। কোটি কোটি টাকা জলের মতো খরচ হয়ে চলেছে একের পর এক মন্দির নির্মাণে, ভিআইপি নেতাদের সুউচ্চ অট্টালিকা তৈরিতে, কিংবা হঠাৎ শখের বশে সরকারি বাস ও রাস্তাঘাটের রং বদলানোর বর্ণময় উৎসবে। এমনকি মন্ত্রীদের আকস্মিক বিদেশ সফরের এলাহি বহর দেখে মনে হয়, অর্থের কোনো অভাবই দেশে নেই।
প্রশ্ন জাগে, তবে কি কেবল অর্থের অভাব শিক্ষাক্ষেত্রেই? নাকি অবহেলার এক দীর্ঘস্থায়ী নীতি এই বঞ্চনাকে টিকিয়ে রেখেছে?যে সরকারই ক্ষমতার মসনদে বসুক না কেন, রাজনৈতিক দলের রঙ বদলায়, কিন্তু গ্রামীণ শিক্ষার কপাল বদলায় না। বছরের পর পর বছর ধরে শিক্ষার উন্নয়নের যে সমস্ত মহার্ঘ প্রকল্প খাতায়-কলমে তৈরি হয়, তা কেবল ফাইলবন্দি হয়েই থেকে যায় বছর শতক ধরে । আর আমলাতন্ত্রের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায় হাজার হাজার কোটির বাজেট।সর্বশিক্ষা অভিযান (SSA) ও পরবর্তী সময়ে সমগ্র শিক্ষা অভিযান (Samagra Shiksha Abhiyan) অনুযায়ী কথা ছিলো প্রাক্-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সকলের জন্য বিনামূল্যে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার। তবে বাস্তব দৃশ্যটা খানিক আলাদা৷
প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলগুলিতে আজও শিক্ষক সংকট, পানীয় জলের অভাব এবং শৌচাগারের বেহাল দশা নিত্যদিনের সঙ্গী ।মিড-ডে মিল বা পিএম পোষণ স্কিম অনুযায়ী কথা ছিলো পুষ্টিকর আহারের মাধ্যমে শিশুদের স্কুলমুখী করার৷ এই প্রকল্পেও দুর্নীতি ও উদাসীনতার চিত্র সর্বগ্রাসী। বহু গ্রামেই কেবল চাল-আলুর হিসেব মেলানোর চক্করে শিশুদের পাতে পৌঁছায় না সঠিক খাবার। মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার হার বাড়াতে ‘রাষ্ট্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অভিযান’ প্রকল্প এলেও গ্রামীণ এলাকার বহু জেলা আজও উচ্চ বিদ্যালয়হীন। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ পেরিয়ে তবেই কিশোর-কিশোরীদের পৌঁছাতে হয় পড়ালেখার ঠিকানায়।খাতায়-কলমে এই প্রকল্পগুলির জন্য বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ আকাশছোঁয়া, কিন্তু মাটির বাস্তবতায় তার হিসেব মেলালে কেবলই শূন্যতা হাতড়ে মরতে হয়। অথচ রাজধানীর বুকে তৈরি হতে পারে সুদৃশ্য ‘নতুন সংসদ ভবন’ , হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে তৈরি হতে পারে ‘প্রধানমন্ত্রীর নতুন বাসভবন’ (Central Vista Project)। দেশের মেগাসিটিগুলোয় আকাশছোঁয়া স্ট্যাচু বা সুসজ্জিত প্রজেক্টের লাইনে অর্থের কোনো টান পড়ে না কখনোই।
তা হলে গ্রামে গ্রামে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন নতুন সরকারি স্কুল গড়ে উঠবে না কেন? কেন গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের সন্তানরা বর্ণমালা শেখার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে? দিল্লির সুউচ্চ সৌধের গম্বুজ যখন দেশের ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করে, তখন পশ্চিমবঙ্গের কোনো আদিবাসী গ্রামের ধূলিমলিন স্কুল চত্বরে এক মুঠো চক-ডাস্টারের অভাবে থমকে যায় একটি শিশুর প্রথম অক্ষর লেখার স্বপ্ন।যে দেশে শিক্ষাকে পেছনের সারিতে ঠেলে দেওয়া হয়, সে দেশের প্রগতির আলো কোনো দিনই শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। গ্রামের স্কুল মানে কেবল কয়েকটি ইট-বালির কাঠামো নয়, গ্রামের স্কুল হলো একটি জনপদের ভবিষ্যতের আশ্বাস।
গ্রামীণ ভারতে শিক্ষার পরিকাঠামো নিয়ে অবহেলার প্রতিবাদে দেশ জুড়ে আন্দোলনে নামার ইঙ্গিত দিয়েছেন ‘সিজেপি’-র প্রধান অভিজিৎ দীপকে। স্বাধীনতা দিবসে এই অভিযান শুরু হবে। গ্রামীণ স্কুলগুলির মৌলিক পরিকাঠামো উন্নতির লক্ষ্যে নাগরিক, অভিভাবক ও গ্রামপ্রধানদের এগিয়ে আসার আবেদন জানিয়েছে সিজেপি।মহারাষ্ট্রে নিজের গ্রাম হিঙ্গোলি থেকে নয়া অভিযানের সূত্রপাত করবেন বলে জানান দীপকে৷ তাদের এই নতুন কর্মসূচী কেবল কিছু দাবি আদায়ের লড়াই নয় হার না মানা মানুষের বেঁচে থাকার এবং মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর লড়াই।

