বিবিসি নিউজ হিন্দির ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গুজরাট-কেন্দ্রিক ছয়টি নিবন্ধিত কিন্তু অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল (RUPP), ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে চাঁদা পেয়েছে বিজেপি ব্যতীত সব জাতীয় দলের চেয়েও বেশি, অথচ ভোটে প্রার্থী দিয়েছে হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র। দলগুলো হল আম জনমত পার্টি, ভারতীয় ন্যাশনাল জনতা দল, গরিব কল্যাণ পার্টি, নিউ ইন্ডিয়া ইউনাইটেড পার্টি, সত্যবাদী রক্ষক পার্টি এবং স্বতন্ত্রতা অভিব্যক্তি পার্টি।
আসলে রাজনৈতিক দলগুলো যে চাঁদা পায় অনুদান হিসেবে, তার বড় অংশ কর হিসেবে প্রদান করতে হয়। মূলত সেই কর ফাঁকি অথবা অর্থ পাচারের এক বৈধ উপায় হিসেবে কাজ করছে প্রায় নিরুদ্দেশ এই দলগুলো।
ছয় দল মিলিতভাবে চাঁদা পেয়েছে প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকা, যেখানে কংগ্রেস, আপ, বিএসপি, সিপিএম ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, এই পাঁচ জাতীয় দল একসাথে পেয়েছে মাত্র ১,৪৮০ কোটি টাকা। অথচ জাতীয় দলগুলো ২০২৪ লোকসভায় প্রার্থী দিয়েছিল ৮৯৩ জন, আর এই ছয় দল মিলিয়ে মাত্র ১৫ জন। চারটি দলের ঠিকানা আহমেদাবাদে, এবং বাকি দুইটি গুজরাটের অন্যান্য প্রান্তে অধিষ্ঠীত।
সবচেয়ে বেশি চাঁদা পাওয়া আম জনমত পার্টি পেয়েছে ৬২০ কোটি টাকা, কংগ্রেসের ২৮১ কোটির দ্বিগুণেরও বেশি, অথচ লড়েছে মাত্র একটি আসনে। দলটির ফেসবুক পেজে সভাপতি হিসেবে এখনও অনামিকা পাসোয়ানের নাম রয়েছে, যিনি বর্তমানে বিহার বিজেপির রাজ্য সহ-সভাপতি। তিনি বিবিসিকে জানান, তিনি ২০২২ সালেই দল ছেড়ে দিয়েছিলেন, তারপরই দলের ঠিকানা বিহার থেকে সরে যায় আহমেদাবাদে। ২০২০-২২ সালে দলটির আয় ছিল সামান্য, কিন্তু ২০২২-২৩ সালেই তা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ২১৬ কোটি টাকায়।
সাংবাদিকরা আহমেদাবাদের অফিসে পৌঁছে দেখেন, সেটি গত ছয় মাস ধরে তালাবন্ধ। দলের কোষাধ্যক্ষ ধর্মেন্দ্র বৈষ্ণব জানান, সব সদস্য পদত্যাগ করায় দলটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ চাঞ্চল্যকরভাবে, দল “বন্ধ” থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকরা দলের নথিভুক্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠাতে সক্ষম হন কোনো বাধা ছাড়াই। গরিব কল্যাণ পার্টি, সত্যবাদী রক্ষক পার্টি ও নিউ ইন্ডিয়া ইউনাইটেড পার্টি – এদের অফিসও একইভাবে জনশূন্য পাওয়া যায়। নিউ ইন্ডিয়া ইউনাইটেড পার্টির সভাপতি অমিত চতুর্বেদীকে প্রশ্ন করাতে, তিনি জবাবে বলেন নিজের দল ছাড়া, তাঁরা “মন থেকে” বিজেপিকে সমর্থন করেন। দলগুলোর ওয়েবসাইট অচল, ফোন নম্বর কাজ করে না, আর অডিট রিপোর্টও উধাও।
দেশে মোট নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ২,৮০০-রও বেশি। এর মধ্যে মাত্র ৬টি জাতীয় দল, ৬৭টি আঞ্চলিক দল, বাকি ২,৭২৭-এরও বেশি এই RUPP শ্রেণির। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে দৈনিক ভাস্করের একটি প্রতিবেদনেও দাবি করা হয়েছিল, গুজরাটের ১০টি “নামহীন” দল ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে মোট ৪,৩০০ কোটি টাকা চাঁদা পেয়েছে, যদিও তারা নির্বাচনে প্রায় অংশই নেয়নি।
Association for Democratic Reforms (ADR) – এর গতবছরের এক রিপোর্ট জানিয়েছিল, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই অস্বীকৃত দলগুলির আয় ২২ % বৃদ্ধি পেয়েছে। বিবিসির এই তদন্ত যেন ADR – এর সন্দেহকেই স্বীকৃতি দেয়। তাছাড়াও এই অস্বীকৃত ২৮০০ টি দলের মধ্যে ৭৩% তাদের অর্থনৈতিক বিবরণ প্রকাশই করেনি।
তদন্ত প্রকাশিত হয়, এই অস্বীকৃত দলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি উত্তরপ্রদেশে, ৭৪৪ টি। দ্বিতীয় দিল্লি যেখানে ২৪০ টি এবং তৃতীয় তামিলনাড়ু যেখানে ২৩০ টি দল রয়েছে। NCPI এই দলগুলোর মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয়, যার বর্তমান লোকসভা সদস্য ২৯। কিছুদিন আগেই তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ২০ জন সদস্য এই দোলে যোগদান করেন।
বিবিসি তাদের এই তদন্ত দলগুলোর ওপর অর্থনৈতিক অনিয়মের অভিযোগ তোলেনি। এত আর্থিক অনুযোগ থাকা সত্বেও কেন এই দলগুলো কোনো প্রার্থী নিয়োগ করেনা। দলের বা জনস্বার্থের উদ্দেশ্যেও যে অনুদানের দাবি করা হয়েছে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে কোটি কোটি টাকা কোথায় যাচ্ছে? নিরর্থক নাকি কোনো জাতীয় দলের বড় কোনো পরিকল্পনা?

