রোদ্দুর ফুরিয়ে এলে আমি কার হাত ধরব?

১৬৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

জীবনযাপনের দৈনিক হিসেবখাতায় বয়স বাড়ার অঙ্কটা বড্ড একঘেয়ে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর আমাদের সকলের চামড়ার ভাঁজে আর পিঠের ব্যথায় কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর শব্দ পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন মহাজাগতিক নিয়ম মেনে সূর্য আর নক্ষত্রদের আলোও নাকি একটু একটু করে কমে আসছে তা আমি নিজেও আজকাল বেশ বুঝতে পারি—বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলে এন্ট্রপি। চারপাশের চেনা পৃথিবীটা ক্রমশ একটা ফিকে হয়ে আসা ড্রইংরুমের মতো, যেখানে চকমকে নতুন সোফাটার রঙ চটে গেছে আর সিলিং ফ্যানটা ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত। মনের ভেতরে জমে উঠছে একটা ঠান্ডা, ধূসর শ্যাওলা। জীবনানন্দ দাশ বহু বছর আগেই তাঁর ‘সুরঞ্জনা’ কবিতায় এই অবক্ষয়ের আঁচ কি বুঝতে পেরেই লিখেছিলেন—
“বয়স বেড়েছে ঢের নরনারীদের,
ঈষৎ নিভেছে সূর্য নক্ষত্রের আলো;
তবুও সমুদ্র নীল: ঝিনুকের গায়ে আলপনা;
একটি পাখির গান কী রকম ভালো।”

অথচ দেখুন, প্রকৃতির কী অদ্ভুত চণ্ডীপাঠ! সে মানুষের এই ক্ষয় নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়। আমাদের মেরুদন্ড বেঁকে যাচ্ছে, অথচ দেখুন সমুদ্রের নীল জল একটুও ফিকে হয়নি। ঢেউগুলো এখনো সেই একই রকম নির্লজ্জ ধারাবাহিকতার সাথে ঝিনুকের পিঠে নকশা কেটে যাচ্ছে। আমি দেখি আমাদের বাগানে যখন একটা পাখি ভরদুপুর বেলায় ডালপালার আড়াল থেকে হঠাৎ ডেকে ওঠে, তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে। সেই ডাকের মধ্যে কোনো জটিল দর্শন নেই, কোনো সেমিনার বা পিএইচডির থিসিস নেই। ওটা স্রেফ একটা শব্দ একটা অনুভূতি। কিন্তু এই ধসে পড়া সভ্যতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ওই সরল সুরটা আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমি আমরা কতটা অপ্রয়োজনীয় ভাবে জটিল হয়ে পড়েছি। একটা পাখির গান যে কতটা ভালো হতে পারে, সেটা বোঝার জন্য আমাদের পুরো একটা জীবন ভুলভাল অঙ্কে কবেই নষ্ট হয়ে বসে আছে। আর এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

আর সবচাইতে সত্যি হল একটা অদ্ভুত দার্শনিক সত্য যা আমাদের গালে চড় মেরে প্রতিমুহূর্তে বুঝিয়ে দেয়, প্রকৃতি আসলে আমাদের কোনো আশ্রয় নয়, সে আমাদের একাকীত্বের চূড়ান্ত সাক্ষী মাত্র। আমরা ভাবি প্রকৃতি আমাদের সান্ত্বনা দিচ্ছে, কিন্তু আসলে সে চরম উদাসীন। আমাদের জন্ম, মৃত্যু বা অবক্ষয় তার কিচ্ছু আসে যায় না। এই যে ঝিনুকের পিঠে নিখুঁত আলপনা কিংবা পাখির গান, এগুলো আমাদের জন্য তৈরি কোনও সাজানো থিয়েটার নয়; এগুলো অবলীলায় ঘটে চলেছে কারণ এটাই তাদের ধর্ম। মানুষের তৈরি করা ‘অর্থ’ বা ‘মানদণ্ড’ ছাড়াই প্রকৃতি সুন্দর। আমরা নিজেদের অজান্তেই প্রকৃতির এই নির্মম ঔদাসীন্যকে রোমান্টিসিজমের চাদরে ঢেকে আত্মতৃপ্ত হই, যাতে নিজেদের অস্তিত্বকে এতটা অর্থহীন বলে না মনে হয়।

আসলে, মানুষ একা থাকতে ভয় পায়। একাকীত্বের এই প্রকান্ড ব্ল্যাকহোল থেকে বাঁচতে সে সারা জীবন একটা কাউন্টার-ওয়েট খোঁজে। আগে একটা চমৎকার ব্যবস্থা ছিল—মানুষ তার সমস্ত একাকীত্ব আর অপরাধবোধ একটা অদৃশ্য, সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ঝুলিতে পুরে দিয়ে নিশ্চিন্তে নাক ডেকে ঘুমোতে পারতো। সেই ঈশ্বর ছিলেন উজ্জ্বল, মেদহীন এবং চূড়ান্ত রোমান্টিক। কিন্তু বুদ্ধির খাঁচায় বন্দি আধুনিক মানুষ নিজেই সেই ঈশ্বরকে গলা টিপে একদিন খুন করে মেরে ফেলেছে। ল্যাবরেটরির টেস্টটিউব আর শেয়ার বাজারের গ্রাফ দিয়ে আমরা সেই অলৌকিকতা কে এমন ভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছি যে, ঈশ্বর এখন স্রেফ ইতিহাসের সিলেবাসে টিকে থাকা একটা চরিত্র মাত্র।

কিন্তু মুশকিল হল, ঈশ্বরকে খুন করার পর শূন্য সিংহাসন টার দিকে তাকিয়ে আমাদের বুকটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। যাকে বলে এক ধরনের মেটামরফিক ডিপ্রেশন। ঈশ্বর তো মরলেন, কিন্তু মানুষের সেই আদিম, কাঙালপনা স্বভাবটা তো গেল না। কবি ঠিকই ধরেছিলেন—
“মানুষ কাউকে চায়—তার সেই নিহত উজ্জ্বল
ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কোন সাধনার ফল।”
তাই নিহত ঈশ্বরের চিতাভস্মের ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ এখন নতুন কোনো অলৌকিকতা আর খোঁজ করছে না। সে এখন খুঁজছে অন্য কোনো মানুষকে, অথবা অন্য কোনো বৈষয়িক নেশাকে। কেউ ক্ষমতার সাধনা করছে, কেউ কবিতার লাইনে মোক্ষ খুঁজছে, কেউ বা মাঝরাতে স্ক্রিন স্ক্রোল করে একটা কৃত্রিম চেনা আঙুলের ছোঁয়া পেতে চাইছে।

এটা আমাদের এক ধরনের অদ্ভুত, বুদ্ধিদীপ্ত দেউলিয়াপনা। আমরা জানি আমাদের সামনে কোনো স্বর্গ নেই, কোনো মোক্ষ নেই। সমুদ্রের নীল আর পাখির গানটুকু বাদ দিলে বাকি জীবনটা আসলে একটা অন্তহীন বিকেলের মতো, যেখানে আলো কমে আসছে কিন্তু রাতও পুরোপুরি নামছে না। এই আধো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আমরা যারা ঈশ্বরের চিতাভস্মের পাশে বসে একটু উষ্ণতা খোঁজার চেষ্টা করছি, আমাদের এই আধুনিক বিষাদটুকুই আসলে আমাদের একমাত্র সম্পদ। আমরা স্বাধীন হয়েছি ঠিকই, কিন্তু সেই স্বাধীনতার একাকীত্ব বহন করার মতো জোর আমাদের এই নড়বড়ে হাঁটুতে নেই।

অন্যান্য প্রতিবেদন.