কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের নাগরিকত্ব যাচাই ও হয়রানির সংকট, ভাষার বুলডোজার! বাংলা থেকে আমেরিকান ক্যাপিটালিজম: সিয়ারসাকারের দাসত্ব ও আভিজাত্যের ইতিহাস অবৈধ মাইনিং এবং পরিবেশ উদাসীনতায় ডুবছে আসাম বালাঘাটে শিশুমৃত্যু,স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা ও বৈগা আদিবাসী সংকট এক বছরের মধ্যে, RSS পরিচালিত ১০০০টি স্কুল খোলার লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী : শিক্ষার গেরুয়াকরণ? মনসুন ওয়েডিং: এক পশলা বৃষ্টিতে ধোয়া সম্পর্কের হিসেব অনুদান কোটি কোটি, প্রার্থী মোটে ১৫! গুজরাটের বেনামী দলগুলোর আড়ালে কি বিশাল কর ফাঁকির খেলা? নেপালে ফের বিপর্যয়ের আশঙ্কা : ধারচুলায় ধসে আটকে গেল নদীর গতিপথ

বাংলা থেকে আমেরিকান ক্যাপিটালিজম: সিয়ারসাকারের দাসত্ব ও আভিজাত্যের ইতিহাস

৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​পোশাক কেবল অবয়ব ঢাকার উপকরণ নয়; এটি ইতিহাস, শ্রেণীসংগ্রাম এবং উপনিবেশবাদের এক নীরব দলিল। আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রীষ্মকালীন আভিজাত্য, ‘Pre context’ (preppy) ফ্যাশন এবং সিনেট হলগুলোর ক্যাজুয়াল পোশাক হিসেবে যে খসখসে, ডোরাকাটা ‘সিয়ারসাকার’ (Seersucker) সমাদৃত, তার মূলে লুকিয়ে রয়েছে ঔপনিবেশিক শোষণ এবং দাসপ্রথার এক অতল ইতিহাস।

‘সিয়ারসাকার’ শব্দটির উৎপত্তি ফার্সি ও রেশমি-সুতি বুননের প্রাচ্য ঐতিহ্য ‘ক্ষীর-ও-শক্কর’ বা ‘শির-ও-শাকার’ থেকে। ফার্সিতে ‘শির’ অর্থ দুধ এবং ‘শাকার’ অর্থ চিনি। মসৃণ দুধ আর দানাদার চিনির বৈপরীত্যকে সুতার বুননে ফুটিয়ে তোলার এই ফোটন-প্রযুক্তি বাংলা ও ভারতীয় উপমহাদেশের তাঁতিদের এক অবিসংবাদিত আবিষ্কার। ‘স্ল্যাক-টেনশন’ বুননশৈলীতে একগুচ্ছ সুতা শক্ত এবং অন্যগুচ্ছ ঢিলে রেখে কাপড়টিতে যে কোঁকড়ানো বা কুঁচকানো (puckered) ভাব আনা হতো, তা আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়ায় ত্বকের সঙ্গে কাপড়ের দূরত্ব বজায় রেখে বাতাস চলাচলে সাহায্য করত। মুঘল ও স্বাধীন বাংলার দরবারে এই কাপড় ছিল আরাম ও সূক্ষ্মতার প্রতীক।

১৭ শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলা থেকে ‘ক্ষীর-ও-শক্কর’ ইউরোপে রপ্তানি শুরু করে, তখন তা ছিল বিলাসদ্রব্য। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক নীতি বাংলার দেশীয় বস্ত্রশিল্প ও তাঁতিদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। ম্যানচেস্টারের কল কারখানায় যখন সস্তা সুতি কাপড়ের গণউৎপাদন শুরু হলো, তখন প্রাচ্যের এই শিল্পকলাকে পশ্চিমের সস্তা মজুরি-ভিত্তিক বাজারের জন্য উপযুক্ত করে নতুন রূপ দেওয়া হলো। ‘শির-ও-শাকার’ রূপান্তরিত হলো ইংরেজদের ‘সিয়ারসাকার’-এ।

A Continous Lean ও Angela’s Vintage Ads-এর সৌজন্যে ভিন্টেজ হ্যাসপেল সিয়ারসাকার বিজ্ঞাপনের সংকলন

আটলান্টিক পেরিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে পৌঁছানোর পর সিয়ারসাকারের রাজনৈতিক অবস্থান এক চরম বৈপরীত্যের মুখোমুখি হয়। ১৯ শতকে আমেরিকান সাউথের তুলো ক্ষেতের কাঠফাটা রোদে দাসত্বশৃঙ্খলে আবদ্ধ মানুষ এবং পরবর্তীতে রেলপথ নির্মাণের শ্রমিকদের প্রধান পোশাকে পরিণত হয় এই কাপড়।
​হিকরি স্ট্রাইপ বা ‘রেলরোড স্ট্রাইপ’ নামে পরিচিত স্থূল সিয়ারসাকার দিয়ে তৈরি পোশাক হতো সস্তা, টেকসই এবং ইস্ত্রি করার প্রয়োজন হত না। এই কাপড় তখন আর কোনো অভিজাত্যের চিহ্ন ছিল না; বরং তা ছিল বঞ্চিত, শোষিত ও কঠোর কায়িক শ্রমে যুক্ত মানুষের ‘দরিদ্রের পোশাক’ (poor man’s fabric)। মালিকশ্রেণী আরামদায়ক পশমী বা মিহি পোশাকে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসত, আর প্রখর রোদে ঘামে ভেজা কৃষ্ণাঙ্গ দাস ও রেলশ্রমিকের গায়ে চড়ানো থাকত এই খসখসে কাপড়।



২০ শতকের শুরুতে সিয়ারসাকারের ক্যাপিটালিস্টিক রূপান্তর ঘটে। ১৯০৯ সালে নিউ অরলিন্সের দরজি জোসেফ হাসপেল যখন গরম আবহাওয়ার জন্য সিয়ারসাকার সুট তৈরি করা শুরু করলেন, তখন আমেরিকান আইভি লিগের ধনকুবের ছাত্ররা এক ধরনের ‘রিভার্স স্নোবারি’ (অহংকারমূলক নিচু পোশাক পরা) থেকে শ্রমিকদের এই পোশাক নিজেদের ফ্যাশনে রূপান্তর করতে শুরু করে।
​যে পোশাক একদা দাসত্ব ও দারিদ্র্যের প্রতীক ছিল, পুঁজিবাদ ও শ্বেতাঙ্গ কেন্দ্রিক ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি তাকে রাতারাতি পরিণত করল ‘গ্রীষ্মকালীন রুচিশীল অভিজাত্য’-এ। মার্কিন রাজনীতিতে ‘সিয়ারসাকার থার্সডে’ পালনের মতো সংস্কৃতি গড়ে উঠল, যেখানে ওয়াশিংটনের অভিজাত রাজনীতিকরা এই পোশাকে নিজেদের সজ্জিত করেন।


​বাংলা অঞ্চলের জলাভূমি আর আর্দ্র আবহাওয়ার জীবন রক্ষাকারী ‘ক্ষীর-ও-শক্কর’ কালক্রমে আমেরিকার তুলাক্ষেতের দাসের গায়ের ঘাম মুছে পরবর্তীতে শ্বেতাঙ্গ অভিজাতদের ড্রয়িংরুমের ফ্যাশনে রূপান্তরিত হয়েছে। সিয়ারসাকারের এই ইতিহাস আসলে বিশ্বায়নের ছাঁচে শ্রমিকের রক্ত ও ঘাম মুছে ফেলে একটি পণ্যের ওপর ‘অভিজাত’ ব্র্যান্ডিং এঁটে দেওয়ার এক প্রকৃষ্ট রাজনৈতিক ইতিহাস।

অন্যান্য প্রতিবেদন.