১ বছরের মধ্যে ১০০০ টি আরএসএস চালিত স্কুল খোলা হবে পশ্চিমবঙ্গে। আরএসএস – এর শিক্ষা শাখা বিদ্যা ভারতীর একটি অনুষ্ঠানে, এমনটাই লক্ষ্য বলে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিদ্যা ভারতীর ৭৪ তম বার্ষিকী উদযাপনে উপস্থিত হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এছাড়াও, সম্পূর্ণ বন্দে মাতরম পাঠ না করলে স্কুলগুলোর অনুদান বন্ধ করে দেবেন এমন কিছু নির্দেশও দেন ওইদিন।
সমগ্র দেশ জুড়ে ১২,০০০ স্কুল পরিচালনা করে আরএসএস। ২০২০ সালেই প্রায় ৩০ লক্ষ ছাত্র – ছাত্রী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে এই স্কুলগুলোর মাধ্যমে। পশ্চিমবঙ্গে আপাতত ৩১৩ টি আরএসএস চালিত স্কুল রয়েছে। এছাড়াও তিনি রাজ্যের শিক্ষা বিভাগীয় চারটি দফতরকে একত্র করার কথা বলেন। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, সংখ্যালঘু শিক্ষার জন্যে কোনো আলাদা সমিতি থাকবে না। আরও বলেন, মুর্শিদাবাদ ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাগুলোতে এই স্কুলগুলো উপস্থাপনের বেশি দরকার, সেই অঞ্চলগুলোতে দেশদ্রোহী কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে বলে।
এই স্কুলগুলোতে “সংস্কৃতি বোধমালা” নামে একগুচ্ছ বই বাধ্যতামূলক, যেখানে বৈদিক যুগের দার্শনিক কণাদকে বলা হয়েছে বিশ্বের প্রথম পরমাণু বিজ্ঞানী, ঋষি ভরদ্বাজকে বিমান চলাচলের জনক, আর শল্যচিকিৎসক সুশ্রুতকে প্লাস্টিক সার্জারির আবিষ্কারক। অথচ বিজ্ঞানীদের মতে, কণাদের লেখা মূল গ্রন্থে “অণু” শব্দটি সম্পূর্ণ দার্শনিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল, আধুনিক পরমাণু-বিজ্ঞানের সাথে তার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এই দাবিগুলো আর শুধু RSS স্কুলে সীমাবদ্ধ নেই। কণাদ ও সুশ্রুত সংক্রান্ত এই তথ্য ইতিমধ্যেই কেন্দ্র সরকার নিয়ন্ত্রিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ওপেন স্কুলিং (NIOS)-এর পাঠ্যক্রমে ঢুকে পড়েছে, যেখানে গত পাঁচ বছরে মোট ৪১ লক্ষ ৩০ হাজার শিক্ষার্থী নথিভুক্ত হয়েছেন। এমনকি NCERT-র চন্দ্রাভিযান সংক্রান্ত একটি মডিউলেও লেখা হয়েছে, “বৈমানিক শাস্ত্র” নামক প্রাচীন গ্রন্থ থেকে জানা যায় ভারতীয় সভ্যতা উড়ন্ত যান সম্পর্কে জ্ঞান রাখত। ২০১৯ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী রমেশ পোখরিয়াল পর্যন্ত দাবি করেছিলেন, নিউটনের আগেই নাকি ভারতীয় শাস্ত্রে মাধ্যাকর্ষণের ধারণা ছিল।
বিজ্ঞানী এবং সমালোচনাকারীরা ইতিমধ্যেই এই ব্যাপারে বলেছেন, ইতিহাসকে ভুল পদ্ধতিতে টানাপোড়েন করা হচ্ছে। ভারতের অন্যতম বিজ্ঞানীরা ববৈদিক যুগের সমস্ত বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে বলছেন, যে পুরাতন ঋষিরা মহাবিশ্ব সম্পর্কে কৌতূহল রাখতেন কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে কখনোই তালমেলাতে পারবে না। ২০২৩ সালে ইসরো ‘ র সোমানাথ দাবি করেন আজকের উন্নতি প্রাচীন ভারতের এক পুরস্কার। প্রতুত্তরে কলকাতার বিজ্ঞানী মঞ্চ বিএসএস প্রশ্ন করে, তাহলে ইসরো রকেট বানাতে প্রাচীন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে না কেন!
সাংবাদিক এবং লেখক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেন, “হিন্দুদের মনকে কম বয়সেই প্রভাবিত করা এবং তাদের মধ্যে প্রাচীন হিন্দু অজেয়তার ধারণা গেঁথে দেওয়া—এমন এক অতীতের চিত্র তুলে ধরা যখন হিন্দু ভারত ছিল বিশ্বজুড়ে এক প্রভাবশালী জাতি, এবং হাজার বছরের দাসত্বের—প্রথমে মুসলিম ও পরে [খ্রিস্টান] ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে—কারণে ভারতীয় সভ্যতার সেই ‘সোনার পাখি’ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।”
বিদ্যা ভারতীর কর্মকর্তারা অবশ্য এসব সমালোচনা মানতে নারাজ। তাঁদের সহজ যুক্তি হলো, পুরনো ঔপনিবেশিক আর বাম ঘরানার ইতিহাসবিদরা এই তথ্যগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন, তাঁরা শুধু সেটাই সামনে আনছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই দাবিগুলোর পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ বা বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই. নারলিকরের মতো বিজ্ঞানী নিজেই দেখিয়ে দিয়েছেন এসব দাবি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় টেকে না। তাই এটাকে “লুকানো ইতিহাস উদ্ধার” বলা আর ভুল তথ্যকে পাঠ্যবইয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া— এই দুইয়ের মধ্যে ফারাকটা স্পষ্ট। সমস্যা হলো, এই ভুল তথ্য এখন শুধু কয়েকটা স্কুলে সীমাবদ্ধ নেই, সরকারি বোর্ড আর নীতিনির্ধারণী কমিটিতেও ঢুকে পড়েছে— আর এটাই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা।
পশ্চিমবঙ্গে সরকারি স্কুলের সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। চলমান সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে না বছর বছর জুড়ে। বাংলার এই বৃহৎ মুসলিম জনসংখ্যাকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র হিন্দুবাদী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উপস্থাপনের পেছনে কাজ করছে এক গেরুয়াকরন রাজনীতি। যেসব বাচ্চারা ছোটবেলা থেকে অপর ধর্মের বিরুদ্ধে এই এক মনোভাব নিয়ে বড় হবে তারা কি পারবে একটি নিরপেক্ষ সমাজকে মেনে নিতে?

