কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের নাগরিকত্ব যাচাই ও হয়রানির সংকট, ভাষার বুলডোজার! বাংলা থেকে আমেরিকান ক্যাপিটালিজম: সিয়ারসাকারের দাসত্ব ও আভিজাত্যের ইতিহাস অবৈধ মাইনিং এবং পরিবেশ উদাসীনতায় ডুবছে আসাম বালাঘাটে শিশুমৃত্যু,স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা ও বৈগা আদিবাসী সংকট এক বছরের মধ্যে, RSS পরিচালিত ১০০০টি স্কুল খোলার লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী : শিক্ষার গেরুয়াকরণ? মনসুন ওয়েডিং: এক পশলা বৃষ্টিতে ধোয়া সম্পর্কের হিসেব অনুদান কোটি কোটি, প্রার্থী মোটে ১৫! গুজরাটের বেনামী দলগুলোর আড়ালে কি বিশাল কর ফাঁকির খেলা? নেপালে ফের বিপর্যয়ের আশঙ্কা : ধারচুলায় ধসে আটকে গেল নদীর গতিপথ

গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে আঘাত, দিল্লির বুকে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশি বর্বরতা ও বাকস্বাধীনতার সংকট

৫২ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

সম্প্রতি ভারতের রাজধানী দিল্লির বুকে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে এক গভীর জাতীয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দিল্লির একটি বেসরকারি অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তের উপস্থিতিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া দুই ইউটিউব সাংবাদিক— শাহিন খান ও নাফিসা খানের ওপর দিল্লি পুলিশের চরম নির্যাতন এবং থানায় নিয়ে গিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনা কেবল পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক আক্রমণই নয়, বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক স্তম্ভ—বাকস্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার একটি বিপজ্জনক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।



​গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ দিল্লিতে আয়োজিত ওই সরকারি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন দুই সাংবাদিক শাহিন খান ও নাফিসা খান। সংশ্লিষ্ট ইউটিউব চ্যানেলটি সম্প্রতি দিল্লির বিজেপি সরকারের কিছু নীতি ও কাজের ত্রুটি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে সমালোচনা করে আসছিল। অভিযোগ উঠেছে, ওই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কিছু কঠিন প্রশ্ন করার পরিকল্পনা ছিল ওই দুই সাংবাদিকের। অনুষ্ঠানস্থলে সেই পরিকল্পনার কথা জানতে পারার পরেই তাঁদের আটক করা হয় এবং সোজা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।


​সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শাহিন খানের অভিযোগ অনুযায়ী, পুলিশ তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় জানার পরই শারীরিক নির্যাতনের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় যাতে তারা বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারেন। এমনকি এই ঘটনার লিখিত অভিযোগ জানাতে গেলেও দিল্লি পুলিশ তা প্রথমে নথিভুক্ত করতে অস্বীকার করে। পরে শারীরিক নির্যাতনের দৃশ্য এবং আঘাতের চিহ্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে সাংবাদিক সমাজসহ দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

​প্রাথমিকভাবে সমস্ত অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়ে দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, ভিআইপিদের সুরক্ষা ও প্রোটোকল বজায় রাখার জন্য নির্ধারিত নিয়ম মেনেই ওই দুই মহিলাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার কারণে মারধরের অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ এবং ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। দিল্লির ডেপুটি কমিশনারের সরকারি সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে এই মর্মে একটি বিবৃতিও পোস্ট করা হয়।
​কিন্তু মানুষের তীব্র প্রতিবাদ এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের প্রবল চাপের মুখে পড়ে পুলিশের সেই বিতর্কিত পোস্টটি পরবর্তীতে সরিয়ে নেওয়া হয়। থানার সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ প্রকাশ করার দাবি জোরালো হলেও পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো স্বচ্ছ অবস্থান নেওয়া হয়নি। এর থেকেই প্রমাণিত হয় যে, ঘটনার সত্যতা ধামাচাপা দেওয়ার এক সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক তৎপরতা চলছে।



​এই ঘটনা ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক অত্যন্ত অন্ধকার দিককে উন্মোচিত করেছে। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হলো সংবাদমাধ্যম, যার মূল কাজ হলো ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শাসকদের জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো। কিন্তু যখন কোনো সাংবাদিক সরকারের সমালোচনা করেন বা নীতিগত প্রশ্ন তোলেন, তখন তাঁদের ওপর প্রশাসনিক দমনপীড়ন চালানো হলে তা সরাসরি ফ্যাসিবাদী মানসিকতার পরিচায়ক হয়ে দাঁড়ায়।
​শাহিন খান ও নাফিসা খানের ওপর চলা এই অত্যাচার প্রমাণ করে যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে ভিন্নমত পোষণ করা এবং সরকারের কাজের সমালোচনা করা ক্রমশ কঠিন ও বিপজ্জনক হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে, যখন ধর্মীয় পরিচয় সামনে এনে সংখ্যালঘু সাংবাদিকদের ওপর অতিরিক্ত হিংসা চালানো হয়, তখন তা রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এবং আইনের শাসনের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়।



​দিল্লির এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের এক চূড়ান্ত রূপ। সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, তা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। যদি পুলিশই সাধারণ নাগরিকদের এবং সাংবাদিকদের রক্ষাকর্তার পরিবর্তে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলির অস্তিত্ব বিপন্ন হতে বাধ্য। আগামী দিনে এই মামলার আইনি পরিণতি এবং দিল্লি হাইকোর্টের রায়ের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও সংবাদমাধ্যম মহল।

অন্যান্য প্রতিবেদন.