কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের নাগরিকত্ব যাচাই ও হয়রানির সংকট, ভাষার বুলডোজার! বাংলা থেকে আমেরিকান ক্যাপিটালিজম: সিয়ারসাকারের দাসত্ব ও আভিজাত্যের ইতিহাস অবৈধ মাইনিং এবং পরিবেশ উদাসীনতায় ডুবছে আসাম বালাঘাটে শিশুমৃত্যু,স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা ও বৈগা আদিবাসী সংকট এক বছরের মধ্যে, RSS পরিচালিত ১০০০টি স্কুল খোলার লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী : শিক্ষার গেরুয়াকরণ? মনসুন ওয়েডিং: এক পশলা বৃষ্টিতে ধোয়া সম্পর্কের হিসেব অনুদান কোটি কোটি, প্রার্থী মোটে ১৫! গুজরাটের বেনামী দলগুলোর আড়ালে কি বিশাল কর ফাঁকির খেলা? নেপালে ফের বিপর্যয়ের আশঙ্কা : ধারচুলায় ধসে আটকে গেল নদীর গতিপথ

বালাঘাটে শিশুমৃত্যু,স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা ও বৈগা আদিবাসী সংকট

৮ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত বালাঘাট জেলার আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একাধিক শিশুর রহস্যমৃত্যু এবং সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সংকট নয়, বরং এটি দেশের নীতি-নির্ধারক মহল, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং প্রান্তিক জনজাতির রাজনৈতিক অধিকারের এক গভীর ও নির্মম চিত্র তুলে ধরে। বুন্দারী ও মাতলাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের আদিবাসী পল্লিগুলিতে যেভাবে একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তা ভারতীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা ও কাঠামোগত বৈষম্যকে প্রকট করে তুলেছে।

বালাঘাটের বিভিন্ন প্রত্যন্ত আদিবাসী জনপদে এমন এক মারাত্মক রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল যা নিমেষে শিশুদের প্রাণ কেড়ে নেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বিষয়টি স্থানীয়দের কাছে রহস্যময় ঠেকলেও, পরবর্তীতে স্বাস্থ্য বিভাগের নমুনায় জানা যায় যে এই সংকটের পেছনে ছিল মূলত ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়া এবং অত্যন্ত সংক্রামক হাম ভাইরাসের মারাত্মক হানা। অনেক শিশুর শরীরে এই দুটি রোগ একসঙ্গে বাসা বেঁধেছিল, যার সাথে যুক্ত হয়েছিল তীব্র অপুষ্টি (Malnutrition) ও বিভিন্ন চর্মরোগ।


​অথচ এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো কতটা অপ্রতুল ছিল, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় প্রশাসন। বহু গ্রামে কোনো আশাকর্মী কিংবা অক্সিলারি নার্স পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি মহামারী শুরু হওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলিতে কোনো স্থায়ী চিকিৎসকও ছিল না। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলির দূরত্ব ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় এবং দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে মুমূর্ষু শিশুদের সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বহু জায়গায় রাস্তাঘাট মোটরচালিত যানের অনুপযোগী হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।

​ভারতের সার্বজনীন টিকাকরণ কর্মসূচির (Universal Immunization Program) আওতায় শিশুদের সুরক্ষার জন্য বিনামূল্যে হাম ও রুবেলার (MR) টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও, দুর্গম এলাকাগুলিতে এর বাস্তবায়ন চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের নথি পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় টিকা প্রাপ্তির হার অত্যন্ত নগণ্য—কোথাও ১৫টি শিশুর মধ্যে মাত্র ৪ জন এই জীবনদায়ী টিকা পেয়েছে। এর ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে এবং অতি সহজেই শিশুরা মহামারীর গ্রাসে পড়েছে। প্রশাসনের তরফ থেকে ফগিং মেশিন বা কিছু সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম।

এর শিকড় লুকিয়ে রয়েছে আদিবাসীদের প্রান্তিকীকরণের মধ্যে। বালাঘাটের বিশাল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অত্যন্ত সংবেদনশীল জনজাতি বা পিভিটিজি (PVTG) হিসেবে চিহ্নিত ‘বৈগা’ সম্প্রদায়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং প্রশাসনের সঙ্গে আস্থার ঘাটতির কারণে স্থানীয় মানুষ চিকিৎসার জন্য মূলত ওঝা বা হাতুড়ে চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন।
​তবে এই স্বাস্থ্য সংকটের নেপথ্যে রয়েছে আরও এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট। বৈগা সম্প্রদায়ের নেতারা ও স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে, ঐতিহ্যগতভাবে তারা যে জঙ্গল ও বনাঞ্চলের ওপর নির্ভর করে নিজেদের জীবন ও পুষ্টির চাহিদা মেটাতেন, সেখানে ক্রমশ কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশি বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে। বন অধিকার আইন বা প্রচলিত সংরক্ষণ নীতির মারপ্যাঁচে তাদের প্রথাগত জীবিকা ও বনজ সম্পদের ব্যবহার সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। জঙ্গলের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলেই আজ এই জনজাতি চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও পুষ্টিহীনতার মুখোমুখি হয়েছে, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ভেঙে দিয়েছে।

​বালাঘাটের এই মর্মান্তিক শিশুমৃত্যুর ঘটনাগুলি কোনো আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় অবহেলা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা এবং আদিবাসী অধিকার লঙ্ঘনের এক সমষ্টিগত ফলাফল। নীতি-নির্ধারকদের নীতিনির্ধারণে কেবল শহুরে দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিয়ে প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের সাংস্কৃতিক বিশ্বাস এবং সাংবিধানিক অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। যতদিন না দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চলাচলের মৌলিক পরিকাঠামো পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে এবং বনবাসী মানুষের অধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে, ততদিন এই ধরনের মানবীয় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব নয়।

অন্যান্য প্রতিবেদন.