কোচবিহার জেলার কৃষি অর্থনীতির দীর্ঘদিনের মেরুদণ্ড হল পাট চাষ। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই অর্থকরী ফসলটি আজ গভীর সঙ্কটের মুখোমুখি। রাজ্যের ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব পরিস্থিতির ফারাক কোচবিহারের প্রায় দুই লক্ষ পাটচাষীর মনে গভীর হতাশার সৃষ্টি করেছে।
অতীতে সিতাই, শীতলকুচি, তুফানগঞ্জ, বা মাথাভাঙার মতো অঞ্চলে জেসিসিআই (JCI)-এর মাধ্যমে হাটে পাট কেনা হলেও বর্তমানে সেই শিবিরগুলি প্রায় বন্ধ। ফলে খোলা বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।
এক বিঘা জমিতে পাট চাষে খরচ হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা, অথচ ফলন ও বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী লাভ থাকে খুবই সামান্য। দিনহাটা বা সাতমাইলের চাষিদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, ৬ মাস পরিশ্রমের পর নামমাত্র আয় হওয়ায় অনেকে এই চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
একসময়ে কোচবিহারে প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হলেও তা কমে বর্তমানে ৩৫-৩৭ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। পাটের জমি দ্রুত দখল করছে ভুট্টা, যদিও সেখানেও নিশ্চিত দামের অভাব রয়েছে।

কেন্দ্র সরকার ঘোষিত পাটচৌদির সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন এমএসপি-র হারকে অপর্যাপ্ত বলে দাবি করেছে সারা ভারত কৃষকসভা। তাদের জোরালো দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাটের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বাড়িয়ে কুইন্টাল প্রতি ১৫ হাজার টাকা করতে হবে।
বাম আমলের চিহ্নিত জমিও পরবর্তীতে অন্য কাজে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে কৃষকনেতারা কোচবিহারে পাটকেন্দ্রিক শিল্প গড়ে তোলার ব্যর্থতার দিকে আঙুল তুলেছেন। কোচবিহারের গ্রামীণ অর্থনীতিতে পাট শিল্প ও বিপণন ব্যবস্থার বেহাল দশা প্রমাণ করে যে নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে কৃষক স্বার্থ আজ অনেকটাই দূরে।
ডাবল ইঞ্জিন সরকারের আমলে কোচবিহারের পাটচাষিদের এই দুরবস্থা কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি এক বড় রাজনৈতিক প্রশ্নচিহ্ন। সরকারি সহায়তা ও ন্যায্য দামের নিশ্চয়তা না মিললে কোচবিহারের ঐতিহ্যবাহী পাট চাষ সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়বে, যা জেলার সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে পঙ্গু করে দিতে পারে।

