নারীদের প্রতিবাদের নতুন ভাষা-চটুল স্লোগানের আড়ালে লুকিয়ে কোন গভীর প্রতিবাদ?

৪৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

“এক কচুরি দো সমোসা, ইন মারদো কা ক্যা ভরসা” কিংবা “এক সুট্টা দো চায় , মর্দ জাত হায় হায়”- স্যোশাল মিডিয়ায় প্রতি তিনটে খবরের পর একটা করে রিল৷ দিল্লি জেন-জি উইমেন্স মুভমেন্ট৷ ধর্ষণ-বলাৎকারের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের এই অভিনব প্রতিবাদ বর্তমান নেট দুনিয়ায় হট টপিক৷ এই স্লোগানগুলি সাধারণ স্টেরিওটাইপ ছেড়ে একদিকে যেমন হয়ে উঠেছে মিম মেটেরিয়াল হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে তেমনই জন্ম দিয়েছে তীব্র বিতর্কের। সমাজের রক্ষণশীল অংশ একে ভাষার ‘অপপ্রয়োগ’ বা সংস্কৃতির অবক্ষয় বলে দেগে দিতে চাইছে। কিন্তু এই চটুল স্লোগানের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত।


ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, নারীর অবস্থান বরাবরই বন্দি থেকেছে এক সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে । শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সতীদাহ প্রথার নামে নারীকে আগুনে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ইতিহাস কিংবা “নারী পড়াশোনা শিখলে বিধবা হয়”—এমন অন্ধকার সামাজিক অনুশাসন এই দেশেরই উর্বর মস্তিষ্কের ফল। বেগম রোকেয়া যখন আলোর সন্ধানে বইখাতা লুকিয়ে রাখতেন হেঁসেলের চালের বয়ামে বা সবজির ঝুঁড়ির আড়ালে, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল নারীর জীবনের অবিরাম লড়াই।


​আমাদের মহাকাব্য ও পুরাণও এই পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে নয়। সীতার মতো চরিত্রকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়, অথচ রামের মতো বীর যোদ্ধা স্বামীও তাকে সামাজিক রোষ থেকে রক্ষা করতে পারেন না। পাঁচজন পরাক্রমশালী স্বামী থাকা সত্ত্বেও পাঞ্চাল কন্যা দ্রৌপদীকে ভরা রাজসভায় পণ্যবস্তুর মতো বাজি রেখে লাঞ্ছিত করা হয়। সেখানেও ব্যর্থ হন ধর্মরক্ষা করতে আসা স্বামীরা। কুরুক্ষেত্রের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দ্রৌপদীর অপমানের প্রতিশোধ নেন অপর এক পুরুষ, দ্রৌপদী নিজে নয়। ভারতীয় ঐতিহ্য ও সাহিত্য চিরকাল নারীকে শিখিয়েছে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হতে। নারীকে কখনো তার নিজের অধিকার, নিজের সম্মান বা নিজের প্রতিশোধ নেওয়ার স্বাধীন অস্ত্র দেয়নি এই সমাজ।

স্লোগান-পোস্টার হাতে রাজপথে মেয়েরা


​আজকের মেয়েরা সেই হাজার বছরের শৃঙ্খলকেই ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। সমাজ এতদিন ধরে যে হেঁসেল, যে চা-কচুরি বা গৃহস্থালির গণ্ডিকে নারীর একমাত্র পরিধি বলে চিহ্নিত করে এসেছে, আজ সেই পরিচিত উপাদানগুলোকেই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ​যে বিষয়গুলোকে সমাজ এতদিন নারীর ‘দুর্বলতা’ বা ‘সীমাবদ্ধতা’ বলে দাগিয়ে দিয়েছিল, আজ সেই প্রতীকগুলোকেই নারীরা নিজেদের অস্ত্র বানিয়ে নিয়েছে। “কচুরি-সমোসা” বা “চা” তো আদতে হেঁসেলেরই উপমা। যখন রাজপথের প্রতিবাদে এই ঘরোয়া শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়, তখন তা পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর মুখে এক মোক্ষম চপেটাঘাত হয়ে ওঠে। এই স্লোগানগুলো বুঝিয়ে দেয়—যে হেঁসেল ঘরকে এতদিন নারীর কারাগার বানিয়ে রাখা হয়েছিল, আজ সেই হেঁসেলের উপকরণ থেকেই জন্ম নিচ্ছে বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ।


​অনেকেই এই স্লোগানের শালীনতার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, বিপ্লব কখনো ব্যাকরণের নিখুঁত নিয়মে জন্মায় না। বিপ্লবের নিজস্ব ব্যাকরণ থাকে, যা আঘাত করে প্রচলিত শালীনতার মুখোশকে। যে সমাজ প্রতিদিন নারীর সম্ভ্রমহানিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, সেই সমাজের তথাকথিত ‘শালীনতা’ আসলে এক ভণ্ডামি বৈকি।


​আজকের নারী আর করুণার পাত্রী নয়। সে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে, নিজস্ব ভাষায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তার ওপর চলা দীর্ঘদিনের শোষণের জবাব এবার রাজপথেই আদায় করা হবে। এই চটুল অথচ শাণিত স্লোগানগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র সামাজিক ব্যাঙ্গ।
​হেঁসেল ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে শুরু করে দিল্লির রাজপথ পর্যন্ত নারীর এই যে সুদীর্ঘ অভিযাত্রা, প্রমাণ করে যে দমিয়ে রাখা যায় না মুক্তির স্পৃহাকে। সীতা বা দ্রৌপদীর নিষ্ক্রিয় অপেক্ষার দিন আজ ফুরিয়েছে। আজকের নারী নিজের লড়াই নিজেই লড়তে জানে, নিজের প্রতিশোধের অধিকার সে ছিনিয়ে নিতে জানে। সমাজের তথাকথিত সংস্কৃতি প্রণেতারা যতই এই ভাষার অপপ্রয়োগ নিয়ে নাক সিঁটকোন না কেন, এই প্রতিবাদী স্লোগানগুলো ইতিহাসের গতিপথকে পাকাপাকিভাবে বদলে দিচ্ছে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.