জন্মদিন আজ— গান্ধী’র। কিন্তু আজ তাঁর মৃত্যুর কথাই বলতে হচ্ছে।
যাঁর জীবনই শুধু এই দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে থাকতে পারত, সেই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মৃত্যু রহস্য দেশের সবচেয়ে মারাত্মক বিপদের পোস্টমর্টেম-রিপোর্ট হয়ে থেকে গেছে।
১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী খুন হন। স্বাধীন দেশের অপরাধ জগতের প্রথম ‘অরগানাইজ্ড ক্রাইম’-এর দৃষ্টান্ত সেই খুন। তিনটি গুলি করা হয়েছিল তাঁকে। অপরাধীরা এসেছিল ভক্তের সাজে। খুনের রিভলবারটি ইতালিতে বানানো ছিল। সিরিয়াল নম্বর ছিল ৬০৬৮২৪। ‘ফ্যাসিস্ট স্পেশাল’ হিসাবে রিভলবারটি পরিচিত।
মুসোলিনির আমলে ইতালিতে ফ্যাসিস্টরা এই অস্ত্রটি ব্যবহার করত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র শক্তি জয়ী হয়। মিত্র শক্তির অংশ ছিল ব্রিটিশরা। ব্রিটিশদের হয়ে যুদ্ধে লড়াই করেছিলেন চতুর্থ গোয়ালিয়র ইনফ্যান্ট্রির কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ভিভি যোশী। এই যোশী মুসোলিনির সেনা অফিসারের আত্মসমর্পণের প্রতীক হিসাবে স্বীকৃত ওয়ার ট্রফি হিসাবে ওই বন্দুকটি পেয়েছিলেন। যুদ্ধের পর যোশী সেই ‘ওয়ার ট্রফি’ রিভলবারটি গোয়ালিয়ারে নিয়ে আসেন। যোশীকে গোয়ালিয়রের মহারাজা জিয়াজিরাও সিন্ধিয়ার এডিসি(নিরাপত্তা প্রধান) হিসেবে নিয়োগ করা হয়।
গোয়ালিয়রের মহারাজার এডিসি-র সেই আগ্নেয়াস্ত্র গডসে আর আপ্তের হাতে পড়েছিল বেআইনি অস্ত্র কারবারিদের মাধ্যমে। যদিও গান্ধীর নাতির ছেলে তুষার গান্ধী তাঁর বইয়ে লিখেছেন,‘‘গোয়ালিয়র কোর্টে কর্মরত একজন শীর্ষ আধিকারিকের কাছে থাকা একটা যুদ্ধের স্মারক ট্রফি কীভাবে বন্দুককারবারির হাতে পড়েছিল আর তার কাছ থেকে বাপুর খুনীদের কীভাবে কাছে পৌঁছেছিল তা কখনও তদন্ত করে দেখা হয়নি।’’
সেই ‘ফ্যাসিস্ট স্পেশাল’ থেকেই তিনটি গুলি গিয়ে আছড়ে পড়েছিল গান্ধীর শরীরে। কিন্তু নাথুরাম গডসে সেই অস্ত্র সরবরাহের দায় কার ঘাড়ে চাপিয়েছিল? গডসে আদালতে জানান,‘‘চরম হতাশা নিয়ে দিল্লি পৌঁছে আমি দিল্লির উদ্বাস্তু কলোনীতে গেলাম। উদ্বাস্তু শিবিরে ঘুরতে ঘুরতে আমার চিন্তাভাবনা একটা স্পষ্ট চূড়ান্ত মোড় নিল। আকস্মিকভাবেই আমার এক উদ্বাস্তুর সঙ্গে দেখা হল — সে অস্ত্রাদির লেনদেন করত এবং আমাকে একটি পিস্তল দেখাল। এটা পাওয়ার জন্য আমি প্রলুব্ধ হলাম এবং তারপর তার থেকে কিনে ফেললাম। এই পিস্তলটাই পরে আমি যে গুলি ছুঁড়েছিলাম তাতে ব্যবহার করেছিলাম।’’
গোয়ালিয়র, মুম্বাই, পুনে — কোথাও অস্ত্র না পাওয়া নাথুরাম গডসে পিস্তল পেলেন ‘আকস্মিকভাবে’ দিল্লির এক উদ্বাস্তু কলোনীতে। একজন উদ্বাস্তু তার মত অচেনা লোককে কিছুক্ষণের মধ্যেই জানিয়ে দিল যে, সে সর্বস্ব হারিয়ে পাকিস্তান থেকে এসে ছ’ মাসের মধ্যে ভারতে অস্ত্রের কারবারী হয়ে উঠেছে। অচেনা এলাকার কয়েক মাসের বাসিন্দা এক উদ্বাস্তু অচেনা গডসেকে একটি পিস্তলও দেখাল! অবশ্য আদালত এমন কোনো উদ্বাস্তুর সন্ধান পায়নি। কিন্তু গান্ধীহত্যার সঙ্গে উদ্বাস্তু এবং উদ্বাস্তু কলোনীকে জড়িয়ে দেওয়ার এই চেষ্টা সুপরিকল্পিত চক্রান্ত।
এই অস্ত্রটি কীভাবে গডসের হাতে পড়েছিল? তিনটি রিভলবার হাতে ছিল তাদের। কিন্তু তা সত্ত্বেও ২০শে জানুয়ারি ওদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ ২০শে জানুয়ারি দুপুরবেলা তারা বুঝতে পারে দুটো বন্দুকের জন্য ভুল ক্যালিবারের গুলি ওদের হাতে রয়েছে। আর তাই সেগুলি কোনো কাজের নয়। আর গোপাল গডসের কাছে আরেকটা যে রিভলবার ছিল, সেই রিভলবারটি জ্যাম হয়ে গিয়েছিল। তাই সেটাও অকেজো। ২১ থেকে ২৮শে জানুয়ারি — নাথুরামরা বন্দুকের খোঁজে অনেক জায়গায় গিয়েছিল। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিল।

কাপুর কমিশনের তদন্তে প্রকাশ হয়েছে যে গোয়ালিয়রে দত্তাত্রেয় পার্চুরের কাছে যাওয়ার পরামর্শ নাথুরামরা কার থেকে পেয়েছিল? পার্চুরে কার উপর আস্থা থেকে নাথুরাম এবং আপ্তের মত দুই প্রায় অচেনা যুবককে অস্ত্রের ব্যবস্থা করে দিতে সম্মত হয়েছিলেন? উত্তর একজনের দিকেই ইঙ্গিত করে। তিনি ‘বীর’ সাভারকর। পার্চুর ছিলেন সাভারকারের অতি অনুগত হিন্দু মহাসভার নেতা। ২৮জানুয়ারি, ১৯৪৮। খুব ভোরেই গডসেরা গিয়েছিল পার্চুরের বাড়িতে। পার্চুরের কাছে নিজের একটি ভালো বন্দুক ছিল। গডসেরা সেটাই চেয়েছিল। কিন্তু পার্চুরে সেটা দিতে অস্বীকার করেন। তবে সাভারকর-ভক্তির কারনে সে রাজি হয়ে যায় একটা পিস্তল জোগাড় করে দিতে। ২৮শে জানুয়ারি বিকেলে দণ্ডবতে জানায় যে সে একটা ভালো অস্ত্র পেয়ে গেছে। সেটা জোগাড় করা হয়েছিল এক পরিচিত বন্দুক কারবারি জগদীশ প্রসাদ গোয়েলের কাছ থেকে। গডসে আর আপ্তে গোয়েলকে ৫০০টাকা দিয়ে বন্দুকটা নিয়েছিল। এভাবেই একটা গোটা ম্যাগাজিন আর বাড়তি ৭ রাউন্ড কার্তুজ সহ খুনের অস্ত্রটা খুনীদের হাতে চলে আসে। সেই সময় ক্লোজ রেঞ্জ থেকে খুন করার অন্যতম জনপ্রিয় অস্ত্র ছিলো সিরিয়াল নম্বর ৬০৬৮২৪-এর এই বেরেট্টা ৯ এমএম সেমি অটোমেটিক পিস্তলটি। ইতালির বেরেট্টা কোম্পানির তৈরি একটা লিমিটেড এডিশন গান হিসেবে এই বন্দুকটা বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল মুসোলিনির সেনাবাহিনীতে কর্মরত অফিসারদের জন্য এবং আজও এটাকে ‘ফ্যাসিস্ত স্পেশাল’ বলা হয়ে থাকে।
গান্ধী হত্যায় দত্তাত্রেয় পার্চুরে ছিল সহ-অভিযুক্ত। গ্রেপ্তারের সময় সে একজন ব্রিটিশ নাগরিক ছিল, এই টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে আবেদনের ভিত্তিতে তাকে খালাস করে দিয়েছিল পাঞ্জাব হাইকোর্ট। যেহেতু গ্রেপ্তারের সময় প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়নি তাই গ্রেপ্তারিটাই অবৈধ হয়ে যায় এবং তাই অকাট্য প্রমাণ এবং তার নিজের স্বেচ্ছা জবানবন্দী থাকা সত্ত্বেও তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি। অর্থাৎ অস্ত্রের মূল বন্দোবস্তকারী ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক। আর গডসে দোষ চাপিয়ে দেয় ‘উদ্বাস্তু’ দের উপর!
এমনই হলো সঙ্ঘ এবং ‘সাভারকারাইট’ রা।
১৯৪৮ এর ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধীর হত্যার পর অনেকের ধারনা ছিল যে, এক উন্মাদ হত্যা করেছে গান্ধীজীকে। বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রটি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেনি। জওহরলাল নেহরু এবং বল্লভভাই প্যাটেল ৩০ জানুয়ারির মর্মান্তিক ঘটনার পর অবশ্য অনুভব করতে পেরেছিলেন এই বৃহৎ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের দিক। নেহরু বলেছিলেন, সাম্প্রদায়িকতার কারনে শুধু দেশই বিভক্ত হয়নি, এতে মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষতের জন্ম দিয়েছে তার নিরাময় সম্ভব কিনা জানি না। তবে তা একইসঙ্গে জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকেও খুন করেছে। ১৯৪৮ সালের ৬ মে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে চিঠি লিখে সর্দার প্যাটেল বলেছিলেন, এত বড় একটি বিপর্যয়ের ঘটনায় হিন্দু মহাসভার সদস্যদের উল্লাস প্রকাশ ও মিষ্টি বিতরণের বিষয়টিতে আমরা চোখ বুঁজে থাকতে পারি না। এই বিষয়ে সারা দেশ থেকেই সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের কাছে আছে।
বিগত সাত দশকে গান্ধীহত্যার রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই ততটা গুরুত্ব পায়নি, যা তার প্রয়োজন ছিল। উপেক্ষিত রয়ে গেছে প্যাটেল ও নেহরুর সতর্কবাণী। তাই গডসে-অনুগামীরা শক্তিধর হয়ে উঠতে পেরেছে।
গান্ধীহত্যার পরদিনই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক কমিটির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় যে সম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখা হয় সেখানে গান্ধীহত্যার বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইকে এক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেদিনের পত্রিকাতেই মুজফ্ফর আহ্মদ ও ভবানী সেনের সই করা কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক কমিটির যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল সেখানেও ছিল এই বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের উল্লেখ। আহ্বান জানানো হয়েছিল এর বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম গড়ে তোলার।

