নরেন্দ্র মোদীর জনজীবনের ২৫ বছর এবং তাঁর জন্মদিবস উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এখন ভক্তির জোয়ার। একদিকে প্রাথমিক স্কুলের কচি কাঁচা থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পের উপভোক্তারা—সবার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এক অদ্ভুত হোমওয়ার্ক। নির্দেশ কড়া: আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর ঠিক সন্ধ্যা ৭টায় বাড়ির বারান্দায় বা উঠোনে প্রদীপ জ্বালাতেই হবে। এ নাকি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মোক্ষম মাধ্যম! সঙ্গে আবার ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর ঝিলিক। কলকাতার গঙ্গার ঘাট থেকে ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলোও ঠিক করেছে মোমবাতি ও রঙিন আলোয় নিজেদের সাজিয়ে তুলবে।
কিন্তু মুশকিল হলো, একদিকে যখন প্রদীপের সলতে পাকানোর সুবাসে আকাশ-বাতাস ম ম করছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ভেসে আসছে এক পোড়া তেলের গন্ধ। অপরিশোধিত তেলের দাম চড়ে যাওয়ায় দেশের রিজার্ভ নাকি হাঁপিয়ে উঠেছে। আর সেই সংকট ঢাকতেই খোদ প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে কদিন আগেই দিয়েছেন এক কড়া দাওয়াই—পেট্রোল-ডিজেল মেপে ব্যবহার করো, কারপুলিং করো, মেট্রোয় চড়ো, পারলে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করো!
ভাবুন একবার পরিস্থিতিটা! কী অপূর্ব এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুগলবন্দী!
সরকার একদিকে চাইছে ঘরে ঘরে আলোর রোশনাই হোক, আর অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলছে—”ভাই, একটু সাবধানে তেল পোড়াও, রিজার্ভে টান পড়েছে!” প্রদীপের সলতে ফুরোলে যেমন তেল দিতে হয়, দেশের কোষাগারও আজ ঠিক সেই দশায়।
সরকারের এই দ্বিমুখী বার্তা সাধারণ মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। একদিকে গঙ্গার তীরে লেজার শো আর ঐতিহ্যবাহী ভবনে আলোকসজ্জা দেখে উন্নয়নের চোটে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার কথা। অন্যদিকে বলা হচ্ছে—গাড়িতে তেল ভরার চেয়ে মেট্রোয় চড়ো, নয়তো বাড়ি বসে জুম মিটিং করো। প্রশ্ন জাগে, যে শিশুটি বা যে গৃহবধূটি ১৭ তারিখ সন্ধ্যা ৭টায় পরম ভক্তিভরে প্রদীপ জ্বালাবেন, পরের দিন সকালে তাকে যখন কাজের সূত্রে বা বাজারে যাওয়ার জন্য সেঞ্চুরি পার করা পেট্রোলের দামের মুখোমুখি হতে হবে, তখন কি তিনি সেই প্রদীপের আলোতেই পথ খুঁজবেন?
একদিকে চলছে ২৫ বছরের রাজনৈতিক জয়জয়কার এবং জন্মদিনের মহা-উৎসব, আর অন্যদিকে খোদ অভিভাবক বলছেন—”সাবধানে চলো, তেল কম পোড়াও, রিজার্ভ বাঁচাও।” পশ্চিমবঙ্গের বুকে প্রদীপ প্রজ্বলনের এই রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ আসলে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক খেলা। তেলের দাম বাড়ার কারণে যখন আমজনতার নাভিশ্বাস উঠছে, ঠিক সেই সময়ে তাদের হাতে প্রদীপ ধরিয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে, তেলের চিন্তা ভুলে আলোর উৎসবে মাতো। কারণ আলো তো আর পেট্রোল দিয়ে চলে না! অন্তত আপাতত নয়।
সবমিলিয়ে, এই সেপ্টেম্বর যেন এক আজব সমাপতন। একদিকে গঙ্গার ঘাটে প্রদীপের আলোয় ইতিহাসের পাতা উল্টানো হচ্ছে, আর অন্যদিকে পেট্রোল পাম্পের বোর্ডে তেলের দামের মিটার দেখে মধ্যবিত্তের মাথায় হাত পড়ছে। প্রদীপের আলোয় ভবিষ্যৎ কতটা ‘বিকশিত’ হবে তা সময়ই বলবে, তবে আপাতত এইটুকু নিশ্চিত যে—তেল ফুরোলে প্রদীপ হোক বা অর্থনীতি, দুটোরই টিমটিম করা ছাড়া আর কোনো গতি থাকে না!

