আজ থেকে দেশব্যাপী প্রতিবাদের ডাক, মুম্বাই থেকে শুরু সিজেপি র আন্দোলন

৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো, নির্বাচন কমিশন এবং বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক যেন দিন দিন নতুন মোড় নিচ্ছে। সম্প্রতি মুম্বইয়ের প্রেস ক্লাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ ডিপকে এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের দাবি তুলে দেশজুড়ে নতুন রাজনৈতিক তরজার জন্ম দিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে মুম্বইয়ের ঐতিহাসিক শিবাজি পার্কে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং এর নেপথ্য রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর।


অভিজিৎ ডিপকের দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। ভারতের মতো বিশালাকার গণতন্ত্রে এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত শিউরে ওঠার মতো। ​বিশ্লেষকদের মতে, শাসক এনডিএ (NDA) এবং বিরোধী ইন্ডিয়া (INDIA) ব্লকের মধ্যে ভোটের ব্যবধান যখন মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, তখন এই ধরনের ব্যাপক মাত্রার সংযোজন-বিয়োজন নির্বাচনী ফলাফলের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। সিজেপি-র অভিযোগ, এটি নিছক কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বিরোধী মতাবলম্বী বা নির্দিষ্ট অংশের ভোটারদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

সাংবাদিক বৈঠকে সিজেপি র নেতৃত্বরা


​ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থার ঘাটতি নতুন নয়, তবে তা সাম্প্রতিক অতীতে তীব্র রূপ ধারণ করেছে। সিজেপি কেবল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিই তোলেনি, বরং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম-এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, সমস্ত ইলেকট্রনিক যন্ত্রই হ্যাক করা সম্ভব এবং সেই কারণে স্বচ্ছতা ফেরাতে পুনরায় ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা উচিত।


​যদিও নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্ট বারবার ইভিএম-এর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলেছে, তবুও রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের একাংশের মধ্যে এই নিয়ে সংশয় কাটছে না। সিজেপি-র এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে সাধারণ মানুষের একটি অংশের মনে গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
​এই আন্দোলনের একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর প্রতিবাদ কেবল নির্বাচন কমিশন বা সরকারের বিরুদ্ধেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রতিও তাদের অনাস্থা স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়গুলি সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও তাঁরা কেন আদালতের রায়ের অপেক্ষা করছেন না, তখন অভিজিৎ ডিপকে সরাসরি বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।


​আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিচারব্যবস্থার কিছু বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের এই প্রকাশ্য সমালোচনা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর ক্রমবর্ধমান অনাস্থারই এক সতর্কবার্তা। আদালতের অনুমতি ছাড়া শিবাজি পার্কে প্রতিবাদ করার ঘোষণা এবং পুলিশের অনুমতির তোয়াক্কা না করার মানসিকতা দেখায় যে, এই আন্দোলনটি মূলধারার প্রচলিত রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে এক তীব্র ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তুলতে চাইছে। ​মুম্বই থেকে শুরু হয়ে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি দেশের অন্য ছয়টি শহরে ছড়িয়ে পড়ার এবং অক্টোবর মাসের শেষে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ এই ধরনের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ বা পুলিশি হেফাজতের হুঁশিয়ারি দিলেও, সিজেপি নেতৃত্ব জেল বা আইনি শাস্তির ভয় না পেয়ে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের হুংকার দিয়েছে।


​পরিশেষে বলা যায়, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র এই আন্দোলন হয়তো সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে মূলধারার রাজনীতিতে খুব বড় কোনো রাজনৈতিক পালাবদল ঘটাতে পারবে না, কিন্তু এটি ভারতের গণতন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মৌলিক প্রশ্নকে পুনরায় উসকে দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা, ভোটার তালিকার শুদ্ধিকরণ, এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির নিরপেক্ষতা নিয়ে জনগণের যে অংশটি প্রশ্ন তুলছে, তাদের সেই ক্ষোভ ও অসন্তোষকে হালকাভাবে দেখার কোনো অবকাশ নেই। একটি সুস্থ ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের স্বার্থে এই প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকট দূর করা অত্যন্ত জরুরি।

অন্যান্য প্রতিবেদন.