সংখ্যালঘু হওয়াই অপরাধ! সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের উপাচার্যের হেনস্থা

২৮ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​ভারতের শিক্ষাঙ্গনগুলো বর্তমানে এক গভীর ও উদ্বেগজনক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের উপাচার্য ও শিক্ষক-ইন-চার্জ মোহম্মদী তারান্নুমের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা দেশের উচ্চশিক্ষায় ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং উগ্র ডানপন্থী ছাত্র সংগঠনের ফ্যাসিবাদী আচরণের এক ভয়ঙ্কর দলিল।


ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল সেমিস্টার পরীক্ষায় বসার জন্য শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম উপস্থিতি বা অ্যাটেন্ডেন্সের নিয়ম কঠোর করার জেরে। বার কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষায় বসতে নির্দিষ্ট শতাংশ উপস্থিতির প্রয়োজন হলেও, কলেজের একটি বড় অংশের শিক্ষার্থীর সেই উপস্থিতি ছিল না। কিন্তু উপাচার্য মোহম্মদী তারান্নুম যখন নিয়ম শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করেন, তখন তা এক তীব্র সংঘাতে রূপ নেয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা একটানা প্রায় ২৩ ঘণ্টা তাঁকে তাঁর নিজের অফিসকক্ষে ঘেরাও করে রাখে। শুধু তাই নয়, ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দিয়ে, তাঁকে মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করে মানসিক ও শারীরিক চাপে ফেলে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে সই করাতে বাধ্য করা হয়।


​পরবর্তীতে মোহম্মদী তারান্নুম পুলিশি সুরক্ষায় বেরিয়ে এসে স্পষ্ট জানান যে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি, বরং তাঁকে ব্ল্যাকমেইল ও চরম হেনস্থা করা হয়েছে। তিনি লিঙ্গ ও ধর্মের ভিত্তিতে তাঁকে টার্গেট করার অভিযোগ তোলেন।


এই ঘটনার সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়টি রচিত হয় মোহম্মদী তারান্নুম কলেজ ছাড়ার পরেই। আরএসএস-এর ছাত্র শাখা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)-র সাথে যুক্ত একদল ছাত্র তাঁর খালি করা অফিসকক্ষে প্রবেশ করে ধূপকাঠি জ্বালায় এবং গঙ্গা জল ছিটিয়ে ঘরটি ‘শুদ্ধ’ বা পবিত্র করার অদ্ভুত ও অবৈজ্ঞানিক তদারকি চালায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আচারটি কেবল কোনো প্রশাসনিক জয়ের উল্লাস ছিল না; এটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও প্রতীকী রাজনৈতিক বার্তা। একজন মুসলিম নারী শিক্ষক ও প্রশাসনিক প্রধানের উপস্থিতি এবং তাঁর বসার আসনকে ‘অশুদ্ধ’ বা ‘দূষিত’ হিসেবে চিহ্নিত করে গঙ্গা জল ছিটানোর এই ঘটনা সরাসরি বর্ণবাদী ও সমকামিতা বা সংখ্যালঘু-বিদ্বেষী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।


​এবিভিপির এই আচরণ প্রমাণ করে যে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে এখন কেবল ভিন্নমত দমন করাই নয়, বরং নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে এক ধরনের অপমানজনক ও ভীতিপ্রদ পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। ফ্যাসিবাদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো ‘অন্যকে’ বা সংখ্যালঘুকে অপবিত্র ও ব্রাত্য হিসেবে প্রতিপন্ন করা—এবিভিপির এই তথাকথিত ‘শুদ্ধিকরণ’ সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই নিখুঁত প্রতিফলন।


এই পুরো সংকটের পেছনে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতি ও ক্ষমতার পালাবদলের এক অস্বস্তিকর সমীকরণ স্পষ্ট। কলেজটির গভর্নিং বডির সভাপতি বিজেপি বিধায়ক কৌস্তভ বাগচী এবং সামগ্রিক ঘটনায় একদিকে যেমন তৃণমূল কংগ্রেস আমলের রাজনৈতিক পক্ষপাত বা অব্যবস্থার অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে বিজেপি ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো এই বিশৃঙ্খলাকে নিজেদের রাজনৈতিক গ্রাউন্ড তৈরি করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা দপ্তর—কোথাও থেকে এই জোরপূর্বক পদত্যাগের বেআইনি ও অগণতান্ত্রিক প্রকৃতির বিরুদ্ধে জোরালো কোনো প্রতিরোধ বা স্পষ্ট অবস্থান দেখা যায়নি। কলেজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বা সরকারি কর্তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন, যা লবিস্ট রাজনীতির এক কালো দিক উন্মোচন করে।


সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ভারতের প্রতিটি প্রান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং উগ্র হিন্দুতাবাদী রাজনীতির ধারাবাহিক আগ্রাসনের এক ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি। যখন শিক্ষাঙ্গনে মেধা, যোগ্যতা ও প্রশাসনিক নিয়মের চেয়ে রাজনৈতিক পেশিশক্তি এবং ধর্মীয় পরিচর্যা প্রধান হয়ে ওঠে, তখন শিক্ষার মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। মোহম্মদী তারান্নুমের লড়াই কেবল নিজের সম্মান রক্ষার লড়াই নয়, এটি স্বৈরাচারী শক্তির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা বাঁচানোর একার লড়াই।

অন্যান্য প্রতিবেদন.