৫০তম বইমেলায় সম্ভাব্য থিম কান্ট্রি ইজরায়েল! বিতর্ক তুঙ্গে

১৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​আসন্ন ৫০তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বাংলার কৃষ্টি ও মননের সবচেয়ে বড় এই উৎসব তার সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে পদার্পণ করতে চলেছে। তবে এবারের বইমেলার রূপরেখা কেবল সাহিত্যচর্চার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির এক সংবেদনশীল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বইমেলার সম্ভাব্য ‘থিম কান্ট্রি’ হিসেবে উঠে এসেছে ইজরায়েলের নাম৷
​
২০২৭ সালের কলকাতা বইমেলার উপদেষ্টা বোর্ডের তরফে ইজরায়েলকে ‘বন্ধুভাবাপন্ন দেশ’ ও থিম কান্ট্রি হিসেবে তুলে ধরার যে প্রাথমিক প্রস্তাব এসেছে, তা আকস্মিক নয়। বর্তমান বৈশ্বিক ও জাতীয় রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ও ইজরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা অত্যন্ত দৃশ্যমান। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি এবং কৃষির মতো ক্ষেত্রগুলোতে দুই দেশের অংশীদারি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার প্রভাব এখন সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পড়তে শুরু করেছে। সমালোচকদের মতে, এই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের নেপথ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদল এবং পরিবর্তিত আদর্শিক সমীকরণ, যা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোকে অনেক সময় রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার হাতিয়ারে পরিণত করে।

​অন্যদিকে, ইজরায়েলের রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক বছর ধরে চলা সামরিক আগ্রাসনে হাজার হাজার শিশুর প্রাণহানি এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও পঙ্গুত্ব বরণের ঘটনা মানবসভ্যতার ইতিহাসে গভীর দাগ কেটেছে। এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে আজ কেবল সাধারণ মানুষ নন, বরং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা কেন লোচ, সুরকার রজার ওয়াটার্স, কিংবা সাহিত্যিক জে এম কোয়েটজির মতো ব্যক্তিত্বরাও সোচ্চার হয়েছেন। প্রতি উইকেন্ডে ইউরোপ থেকে আমেরিকা—বিশ্বের রাজপথ যখন ফিলিস্তিনের পক্ষে স্লোগানে মুখরিত, তখন কলকাতার মতো একটি প্রগতিশীল ও সংস্কৃতিমনস্ক শহরে ইজরায়েলকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি তীব্র নৈতিক প্রশ্নের মুখে পড়েছে।


​
​এই পরিস্থিতিতে কলকাতার ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে যে পাল্টা হুংকার এসেছে, তা বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাম-গণতান্ত্রিক ও প্রতিবাদী ছাত্র রাজনীতির চরিত্রকেই মনে করিয়ে দেয়। ‘ছাত্রসংগ্রাম’ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বইমেলার আনুষ্ঠানিক থিম যদি ইজরায়েল হয়, তবে তাদের পাল্টা থিম হবে ‘প্যালেস্টাইন’। এই সংঘাত কেবল দুটি দেশের ভূ-রাজনীতির লড়াই নয়, এটি আদর্শের সংঘাত—একদিকে রাষ্ট্রীয় শক্তি ও আধিপত্যবাদ, অন্যদিকে মানবতা, ন্যায়বিচার এবং পরাধীন মানুষের মুক্তির লড়াই।
​
​কলকাতা বইমেলা মানেই বাঙালির আবেগ, মুক্তচিন্তার সারণী এবং বইয়ের পাতায় বিশ্বভ্রমণ। কিন্তু যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির রক্তক্ষয়ী সংঘাত এই মেলার দরজায় কড়া নাড়ে, তখন নিরপেক্ষ থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। একদিকে যখন সরকারি স্তরে বন্ধুত্বের বা বাণিজ্যের কূটনীতি কাজ করে, অন্যদিকে তখন সাধারণ মানুষ ও ছাত্র যুব সমাজের নৈতিক বিবেক সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানায়। বইমেলার সুবর্ণ জয়ন্তীর এই উদযাপনে ইজরায়েল বনাম ফিলিস্তিনের এই আদর্শিক দ্বন্দ্ব কীভাবে প্রশমিত হয় বা আয়োজকরা শেষ পর্যন্ত কী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন, তা এখন সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, ২০২৭ সালের বইমেলা শুধু সাহিত্যের পাতা ওল্টাবে না, বরং তা বাংলার রাজনৈতিক সচেতনতার এক নতুন অধ্যায় হয়ে থাকবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.