উগ্রজাতীয়তাবাদ ও গেরুয়াকরণের মতাদর্শে বাপু ‘হানিকারক হ্যায় ‘!

১৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

কিছু বছর আগে ​চলচ্চিত্রের পর্দায় আমির খানের গলায় ব্যঙ্গাত্মক সুরে বেজে উঠেছিল সেই বিখ্যাত পংক্তি— “বাপু সেহত্ কে লিয়ে তু তো হানিকারক হ্যায়”। সেদিন ওটা ছিল এক কঠোর পিতৃতান্ত্রিক ও দমনমূলক শাসন ব্যবস্থার এক হাস্যরূপাত্বক গান। কিন্তু আজকের ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এই কথাটির এক নতুন অর্থ তৈরি হয়েছে যেন। আধুনিক উগ্রজাতীয়তাবাদ এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কাছে মহাত্মা গান্ধী যেন সত্যিই আজ ‘হানিকারক’। তাঁর আদর্শ, তাঁর অহিংসা, এবং তাঁর সর্বধর্মসমন্বয়ের বার্তা আজ ক্ষমতাসীন রাজনীতির মেরুকরণমূলক মতাদর্শের সামনে এক দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর৷ গেরুয়াকরণের রাজনীতিতে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক থ্রেট।

গান্ধীজি


​মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শনের দুই স্তম্ভ – ‘সত্য’ ও ‘অহিংসা’। তিনি বিশ্বাস করতেন যে দেশের মুক্তি কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, বরং প্রতিটি মানুষের আত্মিক ও সামাজিক মুক্তির মধ্য দিয়ে আসে। কিন্তু বর্তমান ভারতের উগ্রজাতীয়তাবাদী ন্যারেটিভ এই দর্শনের ঠিক উল্টো মেরুতে অবস্থান করছে।
​হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি যেখানে শক্তি প্রদর্শন, সংখ্যাগুরুবাদ এবং অন্যকে ‘অন্য’ বা প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করার কৌশলের ওপর আস্থাশীল, সেখানে গান্ধীর অহিংসা ও সর্বধর্মসমভাবের আদর্শ তাদের একচেটিয়া আধিপত্যের রাজনীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়। গান্ধীবাদী দর্শন শিখিয়েছে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা। বর্তমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যখনই মতপার্থক্যকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বা ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে দেগে দেওয়া হয়, তখন গান্ধীর খোলামেলা রাজনৈতিক বিতর্ক ও সংলাপের পরিসরটি বিপন্ন হয়ে পড়ে।

গান্ধীজির রামরাজ্যের কল্পনা কোনো ধর্মীয় একাধিপত্যবাদ ছিল না, বরং তা ছিল এমন এক নৈতিক সমাজব্যবস্থা যেখানে সব ধর্মের মানুষ সমান মর্যাদায় বসবাস করবে। তাঁর প্রার্থনা সভায় ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’-এর সঙ্গে উচ্চারিত হতো ‘ঈশ্বর আল্লাহ তেরে নাম’। এটি ছিল ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির মূর্ত প্রতীক।​ গান্ধী- হত্যাকারী নাথুরাম গডসের মতাদর্শ আজ শুধু বেঁচে রয়েছে তাই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অলিন্দে তাকে মহিমান্বিত করার এক সুসংবদ্ধ প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। এই প্রেক্ষাপটে গান্ধীজির অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে মুছে ফেলা বা লঘু করে দেখানো এই রাজনীতির একটি অবধারিত কৌশল।


গান্ধীজির ‘স্বরাজ’ ও ‘সর্বোদয়’-এর ধারণা বলে গ্রামের স্বনির্ভরতা, কুটির শিল্পের বিকাশ এবং সমাজের সর্বনিম্নে থাকা মানুষের উন্নয়ন – আজকের কর্পোরেট-সর্বস্ব অর্থনীতির যা পরিপন্থী৷ ​আজকের ভারতে যখন রাষ্ট্রীয় সম্পদ গুটিকয়েক শিল্পপতির হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি অবহেলিত হচ্ছে, তখন গান্ধীর গ্রাম স্বরাজের স্বপ্ন এক কোণে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।​শ্রমিকের অধিকার এবং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে গান্ধীর সত্যাগ্রহের হাতিয়ার আজ রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নের মুখে সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের কাটোয়া বাজারে গান্ধীজির মূর্তি কালো কাপড়ে ঢাকা , হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা


​আজকের ভারতে যে উগ্রজাতীয়তাবাদের জোয়ার বইছে, তার মূল ভিত্তি হলো আবেগকে উসকে দেওয়া, ইতিহাসকে বিকৃত করা এবং ভিন্নমতকে দমন করা। এই কাঠামোর মধ্যে গান্ধীজির মূর্তি শুধু একটি প্রতীকী ছবিতে পরিণত হয়েছে, কিন্তু তাঁর আসল চেতনাকে প্রতিনিয়ত গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে।


​তবুও, অন্ধকারের এই ঘনঘটার মধ্যেই গান্ধীজির প্রাসঙ্গিকতা আরও বেশি করে অনুভূত হয়। রাষ্ট্রশক্তি যতই তাঁর চিন্তাকে ‘হানিকারক’ বা ক্ষতিকর বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, ভারতের বহুত্ববাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের আত্মা যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন বাপুর আদর্শই হবে এই দেশের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় নৈতিক শক্তি। কারণ, নিপীড়িত ও সাধারণ মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে গান্ধীজি কোনোদিন ফুরিয়ে যান না—তিনি চিরকালই বেঁচে থাকেন প্রতিরোধের অন্য নামে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.