গল্প হলেও সত্যি: ১৯৬৬-এর সংসারে ২০২৬-এর প্রশ্ন

১৩৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

একটা একান্নবর্তী সংসার। একই বাড়িতে অনেক মানুষ, অথচ প্রত্যেকেই যেন নিজের নিজের ঘরে আলাদা। কেউ কাজ করতে চায় না, কেউ কাজ করেও তার মূল্য পায় না, কারও অভিমান, কারও অলসতা, কারও সামাজিক অহংকার—সব মিলিয়ে সংসারটা চলছে ঠিকই, কিন্তু শান্তিতে নয়। এমন সময় আবির্ভাব ধনঞ্জয়ের। কোথা থেকে এল, কেন এল, আবার শেষে কোথায় চলে গেল—তার কোনও স্পষ্ট উত্তর নেই। কিন্তু যাওয়ার আগে সে বুঝিয়ে দিয়ে যায়, সংসার শুধু রক্তের সম্পর্ক দিয়ে টেকে না; তাকে টিকিয়ে রাখতে হয় সহযোগিতা, দায়িত্ব আর কাজ দিয়ে।

তপন সিংহের ‘গল্প হলেও সত্যি’ তাই শুধু একটি মজার পারিবারিক গল্প নয়। ১৯৬৬-এর একটি পরিবারের ভিতর দিয়ে ছবিটি সেই সময়ের সমাজকেও দেখতে শেখায়। আর মজার ব্যাপার হল, ষাট বছর পরেও ছবির অনেক প্রশ্নের উত্তর আমরা পুরোপুরি খুঁজে পাইনি।

সংসারটা আসলে একটা ছোট সমাজ। ছবির একান্নবর্তী পরিবারটাকে ছোট করে দেখলে শুধু একটা বাড়ি দেখা যায়। একটু দূর থেকে দেখলে বোঝা যায়, এটাই যেন একটা ছোট সমাজ। এখানে বাড়ির কর্তার গুরুত্ব আছে, আবার ছোট্ট শিশুটিরও আছে। যে কাজ করে তার প্রয়োজন আছে, যে কাজ করে না তারও একটা ভূমিকা আছে। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সবাই নিজের দায়িত্বটুকু অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চায়।
‘একটা-আধটা বাসন এক জায়গায় থাকলে ঠোকাঠুকি লাগবেই’—এই কথাটাকে তাই শুধু সংসারের ঝগড়ার সঙ্গে দেখলে কম দেখা হয়। অনেক মানুষ যখন একই জায়গায় থাকে, তখন মতের অমিল হবেই। আসল প্রশ্ন হল, সেই ঠোকাঠুকির পর বাসনগুলো ভেঙে যাবে, নাকি আবার গুছিয়ে রাখা যাবে?
ধনঞ্জয় সেই গুছিয়ে দেওয়ার কাজটাই করে।

ছবির সবচেয়ে সুন্দর কথাগুলোর একটি—“যার যেখানে কাজ, তার সেখানে মুক্তি।”
খাওয়া আর ঘুমের মধ্যে জীবন আটকে গেলে শরীরও একসময় কাজ করার ক্ষমতা হারায়। এই হাসির কথার মধ্যেই একটা বেশ কঠিন সত্যি বলে দেন—পরিশ্রম শুধু সংসারের প্রয়োজন নয়, মানুষের নিজের প্রয়োজনও।
আর রান্না? সেটাও তো একটা শিল্প। রান্না করতে গিয়ে ধনঞ্জয় দেখিয়ে দেয়, কাজকে ছোট-বড় করে দেখলে চলে না; কাজটা কতটা মন দিয়ে করা হচ্ছে, সেটাই আসল। The art of cooking যেন এখানে গৃহস্থালির কাজের অদৃশ্য মর্যাদাটাকেও সামনে আনে।
ঝি-চাকরদের অবস্থান, তাদের কাজ ভাগ করে দেওয়া—সবকিছুর মধ্যে শ্রেণী বৈষম্য স্পষ্ট। উঠোন পরিষ্কার হয় না, কারণ মেথর এসে পরিষ্কার করবে। কাজটা দরকার, কিন্তু যে মানুষটা কাজটা করছে তার সামাজিক মর্যাদা কোথায়?
ধনঞ্জয়ের উপস্থিতি এখানে একটা অদ্ভুত উলটপালট ঘটায়। যে কাজকে অন্যরা সাধারণ বা তুচ্ছ বলে দেখে, ধনঞ্জয় সেই কাজকেই দক্ষতা এবং শিল্পের জায়গায় নিয়ে যায়।

“Tie তো পুরুষদের ব্যবহার করার জন্য”—এই ভাবনাটার মধ্যেই একটা সময়ের লিঙ্গ-ভিত্তিক সমাজ দেখা যায়। আজকের ভাষায় বললে, যেন ‘স্ত্রীদেহ তত্ত্বের’ যুগ—মেয়েকে তার নিজের মানুষ হিসেবে দেখার আগে তার শরীর, পোশাক এবং সামাজিক পরিচয়কে দিয়ে বিচার করার প্রবণতা।

তবু কৃষ্ণার চরিত্রে ছবিটা আরেকটি প্রশ্ন তোলে। মা-বাবা-হারা একটি মেয়ের ভালোবাসারও কি সমান সম্মান পাওয়ার অধিকার নেই? পরিবারের নিয়মের মধ্যে থেকেও তার নিজের পছন্দ, নিজের ভবিষ্যৎ—এসব কি গুরুত্ব পাওয়ার কথা না?
‘গল্প হলেও সত্যি’-র রাজনৈতিক দিকটা মিছিল বা বক্তৃতার মধ্যে নেই। রাজনীতি ঢুকে পড়ে খাবার, কাজ, অভাব এবং কথাবার্তার মধ্যে।

গল্প হলেও সত্যি (১৯৬৬)

১৯৬৬-এর পশ্চিমবঙ্গ ছিল খাদ্যসংকট ও খাদ্য আন্দলনের সময়। খাদ্য ও কেরোসিনের অভাবকে কেন্দ্র করে আন্দোলন হয়েছিল, আর সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিবেশে Congress ও Communist রাজনীতির দ্বন্দ্বও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ফলে ছবিতে Congress-Communist প্রসঙ্গ বা “এটা politics নয়, এটা school”—এর মতো কথাগুলো শুধু হাসির জায়গা নয়; সময়টার রাজনৈতিক উত্তাপও তার মধ্যে ঢুকে পড়ে। খাবারের প্রসঙ্গটাও তাই গুরুত্বপূর্ণ। “আমেরিকা চাল নয়, গম দেয়”—এই কথার মধ্যে শুধু খাবারের আলোচনা নেই; ১৯৬০-এর দশকের ভারতের খাদ্যসংকট এবং বিদেশি খাদ্যসাহায্যের বাস্তবতাও এসে পড়ে। একটি পরিবারের রান্নাঘর থেকে রাষ্ট্রের খাদ্যনীতি পর্যন্ত দূরত্বটা তখন আর খুব বেশি থাকে না।

ধনঞ্জয়ের আরেকটি অদ্ভুত ক্ষমতা হল—সে সবসময় সত্যি বলে সম্পর্ক বাঁচায় না। কখনও সামান্য মিথ্যে বলে সম্পর্ককে ভাঙার হাত থেকে বাঁচায়। গয়নার ঘটনাটাও তাই শুধু চুরি-উদ্ধারের গল্প নয়। প্রশ্নটা দাঁড়ায়—সত্যি বলাই কি সবসময় সবচেয়ে বড় সত্য? নাকি কখনও মানুষের সম্পর্কটাকে বাঁচিয়ে রাখাটাই বড় হয়ে ওঠে? তপন সিংহ এখানে কোনও সহজ নৈতিক শিক্ষা দেন না। বরং মানুষকে তার দুর্বলতা, ভুল আর মিথ্যের মধ্যেও মানুষ হিসেবেই দেখতে শেখান।
ছবির শেষে ধনঞ্জয় চলে যায়। কিন্তু তার চলে যাওয়াটাই যেন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সে কি একজন মানুষ? একজন কাজের লোক? নাকি একটা ধারণা?

হয়তো ধনঞ্জয় আসলে সেই বোধ, যে বোধ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটা সংসার একা একজনের সহযোগে চলে না। প্রত্যেকের কাজের মূল্য আছে, প্রত্যেকের অনুভূতির মূল্য আছে। বাড়ির কর্তা থেকে ছোট্ট শিশুটিও সেই সংসারের অংশ।
তাই ধনঞ্জয় চলে যাওয়ার পর সংসারটা কি সত্যিই বদলাবে, নাকি আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবে—সেটাই ছবির শেষ প্রশ্ন।
আর সেই প্রশ্নটাই ১৯৬৬ থেকে ২০২৬-এ এসে আরও অদ্ভুতভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ আজ পরিবার ভাঙার জন্য সবসময় ঝগড়া বা সম্পত্তি ভাগের প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় ভালো শিক্ষা, চাকরি বা জীবিকার প্রয়োজনেই পরিবারের মানুষকে এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে চলে যেতে হয়। কলকাতায় যেমন কাজের সন্ধানে মানুষ আসে, তেমনই কলকাতা থেকেও অনেকে দিল্লি, নয়ডা, বেঙ্গালুরু, মুম্বইয়ের মতো শহরে ছড়িয়ে যায়। বিয়ের পরও একই কারণে তৈরি হয় নতুন ভৌগোলিক দূরত্ব।

অর্থাৎ, ১৯৬৬-এর প্রশ্ন ছিল—এক ছাদের নিচে এত মানুষ কীভাবে একসঙ্গে থাকবে?
২০২৬-এর প্রশ্ন কখনও কখনও উল্টো—এত দূরে থেকেও কীভাবে একসঙ্গে থাকা যায়?
তবু দূরত্ব মানেই সম্পর্কের শেষ নয়। ফোন, ভিডিও কল, অপেক্ষা আর ফিরে আসার দিন—এসব দিয়েও পরিবারকে ধরে রাখা যায়। শুধু বদলে যায় একসঙ্গে থাকার ধরন।

সমাজে একান্নবর্তী পরিবারগুলো যখন বদলে যাচ্ছে, তখনই যেন আবার আবির্ভাব হোক ধনঞ্জয়ের মতো মানুষের। যদি সামান্য কিছু মিথ্যে দিয়ে সম্পর্কগুলো ঠিক হয়ে যায়, যদি একে অপরের নামে না-বলা দুটো ভালো কথা বলেও রক্তের সম্পর্কগুলোকে আবার জোড়া যায়, যদি কৃষ্ণার মতো মা-বাবা-হারা একটি মেয়ের ভালোবাসা তার প্রাপ্য সম্মানটুকু পায়, যদি নিজের নিজের কাজের মধ্যেই সবাই মুক্তি খুঁজে পায়—তাহলে সেই ছবিটা বারবার ফুটে উঠুক। কারণ সংসারে শান্তি না থাকলে সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের মতো বড় কাজেও কত বাধা আসতে পারে, তার দৃষ্টান্ত ‘গল্প হলেও সত্যি’ খুব সহজভাবে দেখিয়ে দেয়।

১৯৬৬-এর পর ২০২৬-এ এসে ধনঞ্জয়কে আবার দরকার।
হয়তো এবার শুধু একটা সংসার গোছানোর জন্য নয়—দূরত্বের মধ্যেও আমাদের নিজেদের একটু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য।

অন্যান্য প্রতিবেদন.