সংকটে ভারতের জনস্বাস্থ্য, এখনও নিষ্ক্রিয় কেন প্রশাসন?

৫২ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

ইদানিং খাবারে ভেজাল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেরই ধারণা, বাজারে নির্ভেজাল খাদ্যপণ্য পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বাস্তব পরিস্থিতি যা তাতে তাঁদের এই আশঙ্কাকে অমূলক বলা চলে না। নানা অভিযোগ ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রশাসনের চোখের সামনেই বর্তমানে বাজারে দেদারে ভেজাল খাদ্যপণ্য বিক্রি হচ্ছে।

এ সমস্ত ভেজাল খাবারে ক্ষতিকারক রাসায়নিক, কৃত্রিম রং এবং নিম্নমানের উপাদান মেশানো হয়। ফলে বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে জনস্বাস্থ্য। দীর্ঘ সময় ধরে এসব খাদ্য গ্রহণ করলে কিডনি, লিভার, হৃদরোগ ও ক্যানসার’সহ নানা জটিল রোগের সম্ভবনা বেড়ে যায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, শিশুরাও এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

সম্প্রতি স্ক্রল ডট ইনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী,  জনপ্রিয় শিশুখাদ্য সেরেলাক-এর প্রতি আহারে প্রায় ৩ গ্রাম পর্যন্ত চিনি রয়েছে। সুইস সংস্থা পাবলিক আইয়ের ‘দেশভিত্তিক বৈষম্য’-এর দাবি তুলে ধরে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, লন্ডন ও দিল্লি দুই স্থানের ছয় মাস বয়সি শিশুরা  একই ব্র্যান্ডের, একই পুষ্টির প্রতিশ্রুতিযুক্ত ও দেখতে প্রায় একই রকম প্যাকেটের খাবার খায় কিন্তু তার গুনমান আলাদা। ২০২৪ সালে সুইসসংস্থার এই তদন্ত বিশ্বজুড়ে বিতর্ক তৈরি করেছিল। সংস্থার তরফে দাবি করা হয়,
অতিরিক্ত চিনি মেশানোর বিষয়টি মূলত এশিয়া ও আফ্রিকার মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির বাজারজাত সেরেলাকের জন্য প্রযোজ্য। ইংল্যান্ডের মতো প্রথমসারির দেশেরগুলো জন্য নয়। সেখানকার বাজারের জন্য তৈরি শিশুখাদ্য অনেকটাই নিরাপদ। প্রসঙ্গত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা বহু দিন ধরেই শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের খাদ্যতালিকা থেকে অতিরিক্ত চিনি বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছে।

অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট শিশুখাদ্য প্রস্তুতকারী সংস্থা এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, বিশ্বের সমস্ত দেশের শিশুর পুষ্টির চাহিদার কথা মাথায় রেখে তারা খাদ্যপণ্য প্রস্তুত করে।  স্ক্রল ডট ইনের প্রশ্নের জবাবে কোম্পানির মুখপাত্র বলেন, Food Safety and Standards Authority of India (FSSAI) এবং Bureau of Indian Standards (BIS)-এর সব নিয়ম মেনে ভারতে খাদ্যপণ্য প্রস্তুত করা হয়। এ বিষয়ে সংসদে সংস্থার দাবির সঙ্গে সুর মিলিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এখানেই শেষ নয়, প্রতিবেদনে কেলগস কর্ণ ফ্লেক্সের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। ২০১৬ সালে একটি বৈশ্বিক সমীক্ষায় দেখা যায়, ভারতে বাজারজাত কেলগস কর্ণ ফ্লেক্সে লবণের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি। এই একই খাদ্যেপণ্যে ভারতের তুলনায় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলে লবণের মাত্রা ৪৬% কম মেলে। সমীক্ষাটি মোট ২৯ টি দেশকে নিয়ে হয়েছিল বলে জানা যায়।

এর ঠিক পাঁচ বছর পর, ইউরোপে সংস্থাটি শিশুদের জন্য তৈরি খাদ্যপণ্যকে  আরও স্বাস্থ্যকর করে তোলার প্রতিশ্রুতি দেয়। সংস্থাটি ঘোষণা করে, “স্বাদের কোনও পরিবর্তন না ঘটিয়েই ২০২২ সালের শেষ নাগাদ খাদ্যপণ্যে অন্তত ২০ শতাংশ লবণের পরিমান কমানো হবে।” সেই সঙ্গে শিশুখাদ্যে ১০% চিনি কমানোর কথাও  জানায় সংস্থাটি। যদিও ভারতের ক্ষেত্রে তাদের উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। এ দেশের জন্য সংস্থাটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্য প্রস্তুতের কোনও প্রতিশ্রুতি দেয়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

https://scroll.in/article/1093381/why-indias-ambitious-plan-to-curb-unhealthy-food-failed

সাফভাষায় ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ রয়েছে, নিম্নমানের খাদ্যপণ্যের জন্য যে শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি দায়ী, তেমনটাই মোটেই নয়।প্রশাসনের পর্যাপ্ত নজরদারি ও যথাযথ পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। ২০১৭ সালে  চর্বি, লবণ ও চিনি বেশি থাকা খাদ্যপণ্য  HFSS (High Fat, Salt and Sugar) নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে উদ্যোগ নিয়েছিল ভারত সরকার। কিন্তু আট বছর পেরিয়ে গেলেও সেই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি কেবল কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছে।

Nutrition Advocacy for Public Interest-এর চিকিৎসক ড. অরুণ গুপ্ত বলেন, “সরকারি  নথিতে বারবার এই HFSS খাবারের উল্লেখ থাকলেও, আইনগতভাবে শব্দটির  বাধ্যতামূলক সংজ্ঞা কার্যকর করা হয়নি। তাঁর মতে, এ ধরণের অস্পষ্টতাই ভারতে খাদ্য নিরাপত্তায় প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

এদিকে চোখধাঁধানো বিজ্ঞাপন ও প্যাকেটের গায়ে লোভনীয় ছবির মাধ্যমে বেলাগাম মার্কেটিং নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ও প্রশাসনের  সমন্বিত সক্রিয় উদ্যোগও তেমন চোখে পড়ে না। এই সমস্ত নিম্নমানের অস্বাস্থ্যকর খাবার ভারতে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে, যা ক্রমে মহামারীর চেহারা নিচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশে মোট মৃত্যুর ৬০ শতাংশেরও বেশি ঘটেছিল অসংক্রামক রোগের কারণে।

সম্প্রতি দিল্লির ৫৫ বছর বয়সী নির্মল রাওয়ের রোজের পরিশ্রমের কাহিনী তুলে ধরেছে বিবিসি। কিছুদিন আগে অবধিও তিনি বাড়িতে হলুদ গুঁড়ো তৈরি করার কথা ভাবেননি। কিন্তু ইদানিং বাজারজাত পণ্যের ওপর ভরসা না থাকায় তিনি নিজেই রোদে হলুদ শুকিয়ে গুঁড়ো বানান। তাঁর কথায়”এভাবে সময় নষ্ট করতে তিনিও চান না, তবে বাস্তব পরিস্থিতি যা তাতে বাজারের খাবারের ওপর আর বিশ্বাস রাখা যায়না।”

https://www.bbc.com/news/articles/c232mjxpx8no

জানা গিয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয়টির মধ্যে একটি খাদ্যপণ্যের নমুনা গুনমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এই সময়টিতে ১,১০০ টির বেশি ব্যবসা লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকমাস আগে হায়দরাবাদে অভিযান চালিয়ে আধিকারিকরা ৩,০০০ কেজির বেশি ভেজাল চা গুঁড়ো পেয়েছে বলে খবর মিলেছে।

বর্তমানে মানুষ অনেকটাই সচেতন। সেকারণেই হয়তো অনেকেই বাড়িতে পনির, মশলার গুঁড়ো তৈরি করে নিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার ভরসাযোগ্য নামী দামী ব্র্যান্ড বা অর্গানিক পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩৩ সালের মধ্যে ভারতে অর্গানিক পণ্যের বাজারমূল্য ১০.৮১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ভারতীয় মসলা খাতের সংগঠন Federation of Indian Spice Stakeholders জানায়, যে ইউরোপে ভারতীয় মাশলার প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। নিউজ লন্ড্রির প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪-এর শেষে জনপ্রিয় ভারতীয় মশলা কোম্পানি এমডিএইচ এবং এভারেস্টের কিছু মশলাকে পাঁচটি দেশ ব্যান করেছে। শুধু তাই নয়, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ানও বিভিন্ন কারণে ৩৬৫ টি ভারতীয় খাদ্যপণ্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলে জানা গিয়েছে। এছাড়াও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়ার অভিযোগে ভারতীয় লঙ্কার কয়েকটি চালান বাতিল করেছে চীন।এমনকি ফলের রাজা আম’কেও প্রত্যাখ্যান করেছে জাপান। দেশটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ভারত থেকে আপাতত আম আমদানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানিয়েছে।

https://www.newslaundry.com/2026/06/19/china-rejects-indian-chillis-japan-our-mangoes-who-is-checking-what-we-eat

সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, প্রতিবারের মতো এ বারেও জাপানেরর প্রতিনিধি দল ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) পরীক্ষা করতে ভারতে আসে। অভিযোগ, উত্তরপ্রদেশের রেহমানপুরের একটি কারখানা পরিদর্শনের সময় তাঁরা জীবাণুনাশক এবং জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম খুঁজে পান। তাতেই নড়েচড়ে বসে দেশটি। এই সমস্ত উদহারণ দেখলেই বোঝা যায়, বিদেশে খাবারের গুনমান ও নিরাপত্তাজনিত বিষয়ে কতটা কঠোর।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ইংল্যান্ড আমেরিকা ও ইতালির মতো দেশগুলি খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমগুলির বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নথিভুক্ত করে, ফলে কোথাও কোনও দূষিত খাদ্যের খোঁজ মিললে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে ভারতের ক্ষেত্রে দূষিত পণ্যের উৎস খুঁজে বের করতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।অনেক ক্ষেত্রে তা আদৌ সম্ভব হয় না। স্বাভাবিকভাবেই দেশের এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে খাদ্য সুরক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ FSSAI(Food Safety and Standards Authority of India)।

অন্যান্য প্রতিবেদন.