বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়? সেক্যুলার নেতাজির আদর্শ নিয়ে সমস্যা BJP-র! তাই অনন্ত মহারাজ এখনও বাইরে?

মরণোত্তর দেহদানে ”না ” স্বাস্থ্যমন্ত্রীর; জনকল্যাণ বনাম রাজনীতি?

২৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

মৃত্যু অনিবার্য, অথচ তাকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল, সংস্কার এবং ত্যাগের মহিমা অন্তহীন।সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায় সল্টলেকের এক অনুষ্ঠানে সরাসরি আবেদন জানান, মানুষ যেন দয়া করে মরণোত্তর ‘দেহ দান’ (Body Donation) না করেন; বরং জোর দেন ‘অঙ্গ দান’-এর (Organ Donation) ওপর। উদাহরণ হিসেবে তিনি টেনে আনেন রাজ্যের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর দেহদানের প্রসঙ্গ এবং দাবি করেন, সেই দেহ চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনো কাজেই লাগেনি। এই মন্তব্য নিমেষেই আলোড়ন তুলেছে রাজনৈতিক ও চিকিৎসকমহলে। জন্ম দিয়েছে এক গভীর বিতর্কের।


​প্রথমত, রাজনীতির আঙিনায় জ্যোতি বসু কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি এক প্রতিষ্ঠান, এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের প্রতীক। ২০১০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য দান করার সিদ্ধান্তটি কেবল একটি চিকিৎসাগত পদক্ষেপ ছিল না; তা ছিল মার্ক্সবাদী যুক্তিবাদী দর্শনের এক চরম বহিঃপ্রকাশ—যেখানে অন্ধ ধর্মীয় সংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকেও সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানোর আহ্বান জানানো হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে এই ঘটনা বাংলার বুদ্ধিজীবী ও বামপন্থী রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটিয়েছিল। ১৬ বছর পর একজন বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মুখে সেই সিদ্ধান্তকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বা ‘কাজে লাগেনি’ হিসেবে দেগে দেওয়া নিছক একটি প্রশাসনিক মন্তব্য নয়; এর পেছনে রয়েছে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির এক অদ্ভুত শীতল বাস্তববাদ। এখানে আদর্শের চেয়ে ‘লাভ-ক্ষতির গাণিতিক হিসাব’ বা উপযোগিতাবাদ বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।


​দ্বিতীয়ত, চিকিৎসা বিজ্ঞানের দিক থেকে বিচার করলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই অবস্থান চিকিৎসকমহলের একাংশকে বিক্ষুব্ধ করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর যুক্তি ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা থ্রিডি ইমেজিংয়ের যুগে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে আসছে, এবং ব্রেন ডেথ-এর সময় অঙ্গদান করলে তা বহু মানুষের জীবন বাঁচাতে পারত। কিন্তু চিকিৎসকদের মূল অংশ এবং অ্যানাটমি বিশেষজ্ঞরা এর তীব্র প্রতিবাদ্ করেছেন। তাঁদের মতে, ‘ডেড বডি ইজ আওয়ার ফার্স্ট টিচার’। চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রথম পাঠ শুরু হয় ক্যাডাভার (Cadaver) বা মৃতদেহের ব্যবচ্ছেদ থেকেই। স্ক্রিনের ওপর কৃত্রিম থ্রিডি মডেল বা এআই দেখে অস্ত্রোপচার শেখা আর জীবন্ত মানুষের মাংসপেশি, শিরা ও কোষের বুনোট নিজ হাতে স্পর্শ করে অনুভব করার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। তাছাড়া, অঙ্গদান এবং দেহদান দুটি সম্পূর্ণ আলাদা পরিধি। অঙ্গদান সম্ভব হয় মূলত ‘ব্রেন ডেথ’-এর মতো নির্দিষ্ট কিছু আকস্মিক পরিসরে, অন্যদিকে মরণোত্তর দেহদান বিজ্ঞান শিক্ষার এক সুদূরপ্রসারী ও নিশ্চিত ভিত্তিভূমি। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে খাটো করার অর্থ চিকিৎসা শিক্ষার মৌলিক পরিকাঠামোকেই বিপন্ন করা।


​ জীবনাবসানের পর মানুষের শরীর স্রেফ জৈব আবর্জনা হয়ে পড়ে থাকে। জীবন ফুরোলেও তার অবয়ব যদি কোনো শিক্ষার্থীর প্রজ্ঞাকে শাণিত করে, কিংবা কোনো অন্ধ চোখে আলোর রেখা আনে, তবে তা এক প্রকার অমরত্ব লাভ করে। জ্যোতি বসুর মতো ব্যক্তিত্বদের দেহদান কেবল কঙ্কাল বা মাংসের হিসেব নয়, তা ছিল সমাজের চিন্তনকে প্রগতির আলোয় আনার এক নিরন্তর অভিপ্রায়।


​স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বার্তা একদিকে যেমন জনস্বাস্থ্য ও ট্রান্সপ্লান্ট মেডিসিনের ওপর নতুন আলো ফেলতে চেয়েছে, অন্যদিকে তা আঘাত করেছে সেই সামাজিক ও আদর্শগত মনস্তত্ত্বে—যা ত্যাগকে নিছক হিসাবের মাপকাঠিতে মাপতে নারাজ। রাজনীতিতে যুক্তিবাদ আর বিজ্ঞানে প্রগতির সংঘাত নতুন নয়, কিন্তু বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণের মেলবন্ধনে ‘দেহদান’ এবং ‘অঙ্গদান’—কোনোটিই একে অপরের পরিপূরক বৈ প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।

অন্যান্য প্রতিবেদন.