হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীর বিশাল ও বর্ণাঢ্য ভাণ্ডারে কতশত রূপক, প্রতীক। যার প্রতিটি মানুষের চেতনা ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধিকে সমৃদ্ধ করে। তেমনই এক অন্যতম বিস্ময়কর সৃষ্টি হলো নবগুঞ্জর। নয়টি ভিন্ন ভিন্ন পশুর শরীরের অংশ নিয়ে গঠিত এই রূপটিকে ভগবান বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের বিরাট রূপ বা বিশ্বরূপের একটি বিশেষ ও খণ্ড প্রকাশ বলে গণ্য করা হয়। বিশেষ করে ওড়িশার সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলায় নবগুঞ্জর এক অবিচ্ছেদ্য ও মর্যাদাপূর্ণ স্থান রয়েছে।

নবগুঞ্জর নামটির মাঝেই এর অন্তর্নিহিত অর্থ লুকিয়ে রয়েছে—’নও’ (নয়) এবং ‘গুঞ্জর’ (অংশ বা প্রাণী)। এটি এমন এক সত্তা যা নয়টি আলাদা জীব বা প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নিখুঁত সমবায়ে গঠিত। এই প্রাণীর মাথাটি একটি পূর্ণাঙ্গ মোরগের, যা ভোরের আলো ও চেতনার প্রতীক।গলা বা গ্রীবাটি ময়ূরের, যা সৌন্দর্য ও রাজকীয়তার প্রকাশ ঘটায়। এর প্রশস্ত বুক বা বক্ষ সিংহের, যা শক্তি, সাহসিকতা এবং ক্ষমতার পরিচায়ক। এর সাথে রয়েছে একটি ষাঁড়ের কুঁজ, যা উর্বরতা ও ধৈর্যের প্রতীক। নবগুঞ্জরের অগ্রপদ বা সামনের পা হাতির মতো শক্তিশালী।পেছনের পাগুলো বাঘ বা ঘোড়ার মতো ক্ষিপ্রগতির এবং এর লেজটি একটি বিষধর সাপের তৈরি, যা কাল ও অনন্তকালের প্রতীক। সাথে রয়েছে একটি মানব বাহু যা পদ্মফুল বা বিভিন্ন দিব্য অস্ত্র (যেমন চক্র বা শঙ্খ) ধারণ করে ।
মধ্যযুগের ওড়িয়া সাহিত্যের আদি কবি সারলা দাসের রচিত ওড়িয়া মহাভারতে এই অদ্ভুত চরিত্রের প্রথম ও বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। কাহিনীর প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, মহাভারতের অন্যতম প্রধান বীর অর্জুন যখন বনে তপস্যায় লিপ্ত ছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাকে পরীক্ষা করার জন্য, তাঁর সামনে নিজের স্বরূপ প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে এই নবগুঞ্জর রূপ ধারণ করেছিলেন। প্রথম নজরে এই বিকট ও অভিনব রূপটি দেখে অর্জুন বিস্মিত ও কিছুটা আতঙ্কিত হয়েছিলেন। কিন্তু গভীর পর্যবেক্ষণের পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এটি কোনো সাধারণ হিংস্র জন্তু নয়, বরং স্বয়ং কৃষ্ণের এক দিব্য প্রকাশ।

ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী পটচিত্র শিল্পে নবগুঞ্জর একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রধান মোটিফ। পটচিত্র শিল্পীরা নিপুণ হাতে ক্যানভাসে বা কাপড়ে এই নয়টি পশুর অবয়ব ফুটিয়ে তোলেন। প্রাচীনকাল থেকেই পুরীর মন্দিরের রথযাত্রার সময় বা বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে নবগুঞ্জরের চিত্রশিল্প এবং মুখোশ ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।
নবগুঞ্জর ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শন, ওড়িয়া সাহিত্যের ঐতিহ্য এবং লোকশিল্পের এক অমূল্য দলিল। মহাভারতের পটভূমিতে রচিত এই সত্তা যুগ যুগ ধরে ওড়িশার পটচিত্র এবং লোকসংস্কৃতির হাত ধরে তার নিজস্ব মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে আছে।দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে নবগুঞ্জরের রূপটি এক ভিন্ন তাৎপর্য বহন করে। প্রকৃতিতে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রাণী—যেগুলো একে অপরের বিপরীত বা ভিন্ন স্বভাবের (যেমন সাপ ও ময়ূর, বা সিংহ ও হাতি)—তাদের সকলকে একটিমাত্র দেহে একত্রিত করার অর্থ হলো সমগ্র সৃষ্টি জগতের অদ্বৈতবাদ বা ঐক্যের বার্তা দেওয়া।

