সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জনসমক্ষে এসেছে ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) অন্দরমহলের তীব্র মতানৈক্য ও ক্ষমতারদ্বন্দ্ব । প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) এবং দুই নির্বাচন কমিশনারের (EC) মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব শুধু নীতিগত জায়গায় আটকে নেই, বরং তা ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর কার্যকারিতা এবং তরুণ ভোটারদের ভোটাধিকারকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধন (Special Summary Revision বা SSR) প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা এবং এর ফলে উদ্ভূত প্রশাসনিক অচলাবস্থা ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
ভারতের মতো বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতি বছর নতুন ভোটারদের তালিকাভুক্ত করার কাজটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৬৮ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বার্ষিক বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধন (SSR) হয়ে আসছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতি বছর ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করা তরুণ প্রজন্ম—যাঁদের আমরা ‘জেন-জি’ ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি—তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় তোলার সুযোগ দেওয়া হয়।
আগে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য ১লা জানুয়ারিকে একমাত্র কাটিং-ট্রেট বা কাট-অফ ডেট হিসেবে ধরা হতো। এর ফলে ১লা জানুয়ারির পর জন্ম নেওয়া তরুণ-তরুণীদের ভোটাধিকার পাওয়ার জন্য পুরো একটি বছর অপেক্ষা করতে হতো। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে নির্বাচন কমিশন পরে বছরে চারটি নির্দিষ্ট তারিখ—১লা জানুয়ারি, ১লা এপ্রিল, ১লা জুলাই এবং ১লা অক্টোবর—কাট-অফ ডেট হিসেবে নির্ধারণ করে। ফলস্বরূপ, যুবসমাজ আরও সহজে ও দ্রুত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।
কিন্তু ২০২৪ সালের পর থেকে এই বার্ষিক এসএসআর ক্রিয়া পুরোপুরি থমকে গেছে। ২০২৫ সালে Special Intensive Revision বা SIR চালুর অজুহাতে ঐতিহ্যবাহী এই বার্ষিক প্রক্রিয়াটি আর চালুই করা হয়নি। দুই নির্বাচন কমিশনার—সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশি—এই প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর জোরালো সওয়াল করলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরোধিতার কারণে তা আটকে রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক সংস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া মূলত ঐকমত্য বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। কিন্তু সিইসি এবং দুই ইসি-র মধ্যে মতপার্থক্যের মাত্রা এতদূর গড়িয়েছে যে, আইনি পরামর্শ নেওয়ার পরেও এই জট কাটেনি।
সিইসি যেখানে এসএসআর বন্ধ রাখার সপক্ষে বা সংশয়ে ছিলেন, সেখানে দুই ইসি নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ম্যানুয়াল ও আইনি পরামর্শের ভিত্তিতে তরুণদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার এই প্রক্রিয়াটিকে জরুরি বলে মত দিয়েছেন। এই দ্বন্দ্ব কেবল নীতিগত নীতি নির্ধারণে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়েছে কমিশনের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রমেও।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক করুণ প্রশাসনিক চিত্র। ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে বদলি হওয়া প্রায় ৫০ জন শীর্ষ আধিকারিক—যাঁদের মধ্যে প্রধান নির্বাচনী আধিকারিক (CEO) এবং উপ-নির্বাচন কমিশনাররাও রয়েছেন—তাঁদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন বা এসিআর আটকে রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, সিইসি এবং দুই ইসিকে যৌথভাবে এই নথিতে স্বাক্ষর করতে হয়। কিন্তু বর্তমান ঠান্ডা লড়াই ও পারস্পরিক অনাস্থার কারণে তাঁরা একসঙ্গে বসে এই কাজ সম্পন্ন করতে পারছেন না।
বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, গোয়া, উত্তরাখণ্ড এবং পাঞ্জাবের মতো রাজ্যগুলিতে আসন্ন বিধানসভা ও উপনির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ভোটার তালিকার এই হযবরল পরিস্থিতি বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। গোয়া এবং উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গেলেও এসএসআর না হওয়ায় নতুন ভোটারদের তালিকাভুক্তির রাস্তা বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, বিহারে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে রোল রিভিশন থমকে আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো একটি সংবেদনশীল ও রুটিন কাজকে ঘিরে শীর্ষ নেতৃত্বের এই টানাপোড়েন গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। জেন-জি প্রজন্মের প্রথমবার ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকারকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের বলি হতে দেওয়া যায় না। অতি দ্রুত সিইসি এবং ইসি-গুলির মধ্যেকার বরফ গলিয়ে এসএসআর প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাপনাকে ছন্দে ফেরানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

