দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছে, মূলত এসআইআর প্রক্রিয়া, ভোটার তালিকার তথ্য ব্যবস্থাপনা ও ফর্ম ৬-এ পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে, যেখানে তাঁদের অন্ধকারে রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। যদিও নির্বাচন কমিশনের সরকারি বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং গত এক বছরের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে।এই রিপোর্ট প্রকাশের পরই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সরব হন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী, আর শুক্রবার দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ।
দেশের রাজধানীতেই বিক্ষোভের তীব্রতা ছিল সবচেয়ে বেশি। কংগ্রেস সমর্থকরা ব্যারিকেড ভেঙে নির্বাচন কমিশনারের দফতরের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশ বেশ কয়েকজনকে আটক করে। দুপুরের পর আটক হন যোগেন্দ্র যাদব, আইসা নেত্রী নেহা বরা, অঞ্জলি ভরদ্বাজ ও দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের মতো পরিচিত মুখও। দিল্লি কংগ্রেস সভাপতি দেবেন্দ্র যাদব সরাসরি বলেন, গণতন্ত্র ধ্বংস হতে দেখেও চুপ থাকা সম্ভব নয়। এছাড়া ভারতীয় যুব কংগ্রেসের কর্মীরা জ্ঞানেশ কুমারের মুখাকৃতির মুখোশ পরে, হাতে হাতকড়া লাগিয়ে রায়সীনা রোড থেকে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতর পর্যন্ত প্রতীকী মিছিল করেন। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, এই বিক্ষোভের জন্য আগাম কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি।
পাটনায় মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের দফতর অভিমুখে এগোনো বহু কংগ্রেস সমর্থককে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে জলকামান ব্যবহার করতে হয়, যা অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এখানকার বিক্ষোভের উত্তাপ সবচেয়ে বেশি ছিল বলে প্রমাণ করে।
অসমে বিক্ষোভ চলাকালীন জেলা কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈ-সহ একাধিক কর্মীকে পুলিশ আটক করে। মণিপুরের রাজধানী ইমফলেও বিরোধী দলগুলির সম্মিলিত বিক্ষোভ দেখা যায়, যা উত্তর-পূর্ব ভারতেও এই আন্দোলনের বিস্তার স্পষ্ট করে। এছাড়া পুদুচেরি, শিমলা, শ্রীনগর, দেহরাদুন, জম্মু ও কলকাতা-সহ একাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়ে এই বিক্ষোভের ঢেউ, যা দেখিয়ে দেয় এই ইস্যু নিছক কোনো একটি রাজ্যের নয়, বরং সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
শুধু রাজনৈতিক দলই নয়, এই বিতর্কে যুক্ত হয়েছে নতুন সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-ও। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জ্ঞানেশ কুমারকে “সবচেয়ে বড় দেশদ্রোহী” আখ্যা দিয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগের আলটিমেটাম দেন। নয়তো, দেশজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। তাঁদের দ্বিতীয় দাবি, আসন্ন নির্বাচনগুলি স্থগিত রেখে অবিলম্বে এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ করা হোক। একইসঙ্গে এই বিতর্ক এবার পৌঁছে গেছে সুপ্রিম কোর্টেও। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সাধারণ অভিযুক্তের মতো বিচারের দাবিতে দায়ের হওয়া একটি মামলায় সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়েও তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য পুরো ঘটনাটা অস্বীকার করেনি। তাদের বক্তব্য হলো, সুখবীর সান্ধু ও বিবেক জোশীর আপত্তিগুলো ছিল স্বাভাবিক “ইনপুট” বা মতামত, যা যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনায় হতেই পারে। কিন্তু এখানেই একটা প্রশ্ন থেকে যায়, যদি সিদ্ধান্ত আগেই চূড়ান্ত হয়ে যায়, আর তারপর সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কেউ আপত্তি জানান, তাহলে সেটাকে “ইনপুট” বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত? ইনপুট তো নেওয়া হয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে, পরে নয়। নির্বাচন কমিশনের বিবৃতি থেকে বোঝা যায়, আপত্তি থাকলেও শেষমেশ একটা ‘সবাই একমত’ ভাবমূর্তি বজায় রাখার চেষ্টা হয়েছে বাইরে থেকে, ভেতরের প্রকৃত মতবিরোধ আড়াল করেই। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট দেওয়া নয়, ভোট প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা থাকাটাও সমান জরুরি। আর এই ঘটনা সেই আস্থার জায়গাটাতেই সরাসরি আঘাত হেনেছে।

