‘গাঁও ছোড়ব নাহি জঙ্গল ছোড়ব নহি
মায় মাটি ছোড়ব নহি লড়াই ছোড়ব নহি’
জল-জঙ্গল-জমি বাঁচাতে অভিনব প্রতিবাদে মধ্যপ্রদেশের ছতরপুরের আদিবাসীরা। কোমর সমান নদীর জলে সারি সারি দাঁড়িয়ে, শুয়ে যেন জীবন্ত মৃতদেহ। কেউ প্রতীকী চিতা সাজিয়ে তার উপর বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন, কেউ কেউ গলায় ফাঁস লাগিয়ে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দেখে যেন মনে হবে সারিবদ্ধ জীবন্ত মৃতদেহ। কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্পের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর জেলার দৌধন, মাঝগাঁও, রুঞ্জ, পান্নার কয়েক হাজার আদিবাসীরা গণআত্মহত্যার হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন।
সরকারের উন্নয়নের বলি হতে বসেছেন ছাতারপুরের একাধিক গ্রামের আদিবাসী মানুষজন। আন্দোলনকারীদের একাংশ বারানা নদীর সেতুর নীচে প্রতীকী ‘চিতা আন্দোলন’ শুরু করেছেন। ‘কেন-বেতওয়া রিভার লিঙ্ক প্রোজেক্ট’ এর মাধ্যমে কেন নদীর অতিরিক্ত জল বেতওয়া নদীতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দু বুন্দেলখণ্ড অঞ্চল। বহুদিন ধরেই খরা, জলসংকটে ভুগছে এই অঞ্চল। এই সমস্যার সমাধানেই রিভার লিঙ্ক প্রকল্পের নকসা করেছিল মধ্যপ্রদেশ সরকার।
তবে বৃহৎ পরিকাঠামো বা উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে যেমনটি হয়ে থাকে, তেমনই কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্প নিয়েও একাধিক উদ্বেগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে ভৌগোলিক কাঠামো বদলে দেওয়ার মতো ব্যাপক প্রকৌশল ও যন্ত্রনির্ভর নির্মাণকাজের কারণে ওই অঞ্চলের একাধিক পরিবারকে উচ্ছেদ করার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্পের জেরে এই অঞ্চলের ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এর মধ্যে অনেক পরিবারকে নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হতে পারে। আবার বহু মানুষের জীবিকা, যা মূলত কৃষি, বনজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল, তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু মানুষই নয়, প্রকল্পের প্রভাব পড়তে পারে বন্যপ্রাণের ওপরও। পান্না টাইগার রিজার্ভের বনাঞ্চলে অন্তত ৮০টি বাঘের বাস রয়েছে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, প্রকল্পের কারণে ওই বাস্তুতন্ত্রও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। কাটা পড়তে পারে লক্ষ লক্ষ গাছও।

আর এতেই বিরোধিতায় একজোট হয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, প্রকল্পের কারণে জমি, বন, জল এবং জীবিকা হারানো তাঁদের কাছে মৃত্যুর সমান। উপযুক্ত পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণ ছাড়া এই প্রকল্প তাঁরা মানতে নারাজ। অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের দাবি, আন্দোলনকারীদের একাধিক দাবি ইতিমধ্যেই পূরণ করা হয়েছে। ছাতারপুরের জেলাশাসক পার্থ জয়সওয়াল বলেন, “রাজ্য সরকার ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের প্যাকেজ আরও উন্নত করেছে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা এখন আরও বেশি সুবিধা দাবি করছেন।” জানা গিয়েছে তাঁদের উচ্ছেদের বিনময়ে ১২.৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গ্রামবাসীদের দাবি এই টাকায় নতুন করে জীবন শুরু করা সম্ভব নয়। একাধিক ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের তালিকায় নাম নেই বলেও অভিযোগ তাঁদের।

২০২৩ সাল থেকে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে আসছেন গ্রামবাসীরা। সেইসময় তাঁদের দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে আন্দোলনে ইতি টানা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শুধু পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণের দাবি নয়, জল-জমি-জঙ্গল বিপন্ন হলে তাঁদের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই দাবি পূরণ এবং প্রকল্পের স্থগিতাদেশ না আসা অবধি আমরণ অনশনেরই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গ্রামবাসীরা।
আন্দোলনরত পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্য, তাঁদের আপত্তি প্রকল্পের বিরোধিতা করা নয়। বুন্দেলখণ্ডে জল পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগকে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করেন। তবে তাঁদের প্রশ্ন, যদি সেই উন্নয়নের বিনিময়ে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা, পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা এবং পরিবেশের বড়সড় ক্ষতি হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের মূল্য কতটা গ্রহণযোগ্য?
