বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নির্দিষ্ট নাম আজ গভীর ক্ষত এবং সুতীব্র প্রতিবাদের প্রতীক—‘অভয়া’। আর জি কর আকস্মিকতার জেরে যাঁদের জীবন এক পলকে ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল, সেই অভয়ার মা রত্না দেবনাথের রাজনীতিতে পদার্পণ এবং পরবর্তীতে তাঁর মুখনিঃসৃত আক্ষেপ—”রাজনীতিতে আসতাম না, যদি সবকিছুর পরিবর্তন হতো”—আজ বাংলার রাজনৈতিক ময়দানে এক গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আরজি কর-কাণ্ডের পর বিচার পাওয়ার দাবিতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নিহত চিকিৎসকের পরিবার শুরু থেকেই এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্তের দাবি জানিয়েছিল। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পরিসরে যুক্ত হয়ে রত্না দেবনাথ বিভিন্ন সময়ে সরব হয়েছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি স্পষ্টতই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনৈতিক মঞ্চে পা রাখলেও বিচারব্যবস্থার গতি-প্রকৃতিতে কাঙ্ক্ষিত কোনো পরিবর্তন আসেনি। “বিচার ব্যবস্থা এগোচ্ছে না”—এই আক্ষেপ শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং সমগ্র বিচারপ্রার্থী সমাজের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।
ঘটনার তদন্তভার সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়া হলেও দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগে আজ এই কেন্দ্রীয় সংস্থার কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে। রত্না দেবনাথের অভিযোগ, মূল সাক্ষীদের প্রামাণিক বয়ান বা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার প্রবণতা এবং বিচারালয়ের বিভিন্ন যুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর জোরালো প্রশ্ন—অপরাধীরা পেশায় চিকিৎসক হওয়ার কারণে কি তাদের ছাড় দেওয়া হবে? অপরাধী সবসময়ই অপরাধী, তার পেশাগত পরিচয় দিয়ে তাকে আড়াল করার চেষ্টা বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে তলানিতে ঠেকিয়ে দেয়। এই ধরনের আইনি মারপ্যাঁচ এবং দীর্ঘসূত্রিতা বিচারপ্রার্থী পরিবারকে আরও বেশি হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই পুরো ঘটনায় শুধু নিম্ন আদালত বা তদন্তকারী সংস্থাই নয়, তৎকালীন প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্য দপ্তরের ভূমিকা নিয়েও বারবার প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি হাসপাতালের নিরাপত্তা এবং পরিকাঠামোর ত্রুটি যে নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতার ফল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। রত্না দেবনাথ সরাসরি তৎকালীন প্রশাসনিক শীর্ষস্তর ও সংশ্লিষ্ট মহলের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। সরকারি ছত্রছায়া বা নির্দেশ ছাড়া একটি সরকারি হাসপাতালের ভেতরে এই ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটা অসম্ভব বলেই পরিবারের দাবি। এই রাজনৈতিক আক্রমণ প্রমাণ করে যে, অপরাধের বিচার কেবল আইনি মারপ্যাঁচে সীমাবদ্ধ নয়, এর সাথে জড়িত রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ক্ষমতার জবাবদিহিতার প্রশ্নও।
যে দেশে মাতৃত্বকে সর্ব্বোচ্চ আসনে বসিয়ে পুজো করা হয়, সে দেশেরই এক মা কে যখন বিচার চেয়ে রাজনীতির জাঁতাকলে নামতে হয়, তখন তা সমাজব্যবস্থার এক চরম ব্যর্থতার দিকেই আঙুল তোলে। রত্না দেবনাথ বারবার স্পষ্ট করেছেন যে, ক্ষমতা বা রাজনৈতিক পদের প্রতি তাঁর কোনো মোহ ছিল না। তিনি সাধারণ এক আটপৌরে মায়ের জীবনই চেয়েছিলেন। কিন্তু বিচার পাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষা, পদে পদে সিস্টেমের উদাসীনতা এবং ন্যায়বিচারের দীর্ঘসূত্রতা তাঁকে বাধ্য করেছে এমন এক ময়দানে পা রাখতে, যে ময়দানকে তিনি একসময় কেবল নোংরা কালিমায় চিহ্নিত করতেন।
আজকের বাংলা তথা ভারতের রাজনীতিতে ‘পরিবর্তন’ শব্দটির একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সাধারণ মানুষ যখন ভোটবাক্সে পরিবর্তন আনে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য থাকে সুরক্ষা, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন। কিন্তু যখন সেই পরিবর্তিত ব্যবস্থার ভেতরেও অভয়ার মতো তরুণী চিকিৎসকদের মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করতে হয় এবং বিচার পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তখন সেই পরিবর্তনের অর্থ নিয়ে বড়ো রকমের প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়।
রত্না দেবনাথের এই সাম্প্রতিক মন্তব্য এক চরম হতাশা ও অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। সিবিআই তদন্তের মন্থর গতি, আইনি জটিলতা এবং অপরাধীদের পেশাগত পরিচয়কে ঢাল করার প্রবণতা বিচারপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে। রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ যে কতটা কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ, এই ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। অভয়ার মায়ের এই প্রতিবাদ কেবল ব্যক্তিগত আকুতি নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির এক নির্মম আয়না।

