এই সরকার “টিকা, শিখা, ধুতি, তুলসীর সরকার”- বাঙুর জাগরণ মঞ্চ থেকে সাফ জানিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী

২৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

রবিবার কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ‘বাঙুর জাগরণ মঞ্চ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল গীতাপাঠের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাগেশ্বর ধামের প্রধান ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক এবং তাঁর ছবি পোড়ানোর ঘটনার তীব্র নিন্দা করে মুখ্যমন্ত্রী কড়া বার্তা দেন। এই ঘটনা বাংলার সমসাময়িক রাজনৈতিক ময়দানে দীর্ঘমেয়াদী মেরুকরণ ও ভাবাদর্শগত লড়াইয়ের এক স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গে এসে বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর কিছু মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তাঁর সেই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ শুরু হয় এবং ভবানীপুরসহ কিছু এলাকায় তাঁর ছবি বা পুত্তলিকা পুড়িয়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়। এই ধরনের প্রতিবাদকে সনাতন ধর্মের সাধু-সন্ত ও আধ্যাত্মিক গুরুদের প্রতি অসম্মান হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক ডানপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। উক্ত অনুষ্ঠানে এই প্রসঙ্গটি টেনে এনে স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী৷ বলা হয় যে, সাধু-সন্ত ও মহারাজদের অবমাননা করলে রাজ্য সরকার আইনানুগ কঠোর পদক্ষেপ নেবে এবং দোষীদের অবিলম্বে জেলে পাঠানো হবে। অতীতে এই ধরনের ঘটনায় অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারের উদাহরণ টেনে হুশিয়ারি দেন তিনি৷

এই ধরনের জনসমাবেশ ও কড়া বার্তা দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী ও সনাতনী ভাবাবেগকে রাজনৈতিক শক্তির মূলস্রোতে আরও পোক্ত করা। মুখ্যমন্ত্রী তার বক্তৃতায় স্পষ্ট জানান- এই সরকার “টিকা, শিখা, ধুতি, তুলসীর সরকার। গোমাতাকে রক্ষা করার সরকার। একদম ভয় পাবেন না।”- একটি গণতান্ত্রিক দেশের সরকার যখন জনসম্মুখে দাঁড়িয়ে এ ধরনের নির্দিষ্টকরণের বার্তা দেন, তখন তা ফের মেরুকরণের রাজনীতিকে প্রকট করে তোলে৷

ধর্মীয় বক্তৃতার পাশাপাশি অনুষ্ঠানে জাতীয় ও রাজ্য স্তরের বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুও জোরালোভাবে উত্থাপন করেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের ভেতরে দেশবিরোধী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী স্লোগান, বিশেষ করে শ্রীরামপুরের একটি সভার প্রসঙ্গ টেনে ‘আজাদি’ স্লোগান তোলার তীব্র সমালোচনা করা হয়। জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশপ্রেমের ইস্যুকে সামনে এনে ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ – এর বিরুদ্ধে সমাজকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি। এর নেপথ্যে মূল কৌশল হলো—ধর্মীয় আবেগ এবং জাতীয়তাবাদী চেতনাকে একই সূত্রে গেঁথে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা।

আগামী দিনে আরও বৃহৎ পরিসরে—যেমন আগামী ডিসেম্বরের শেষ দিকে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে বিশাল গীতাপাঠের মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যেখানে জাতীয় স্তরের বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ও আদর্শগত সংগঠনের শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ধরনের মেগা ইভেন্টগুলি প্রমাণ করে যে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ধর্ম ও সংস্কৃতির পরিসরটি নির্বাচনী লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান ময়দান হয়ে উঠতে চলেছে।


সর্বোপরি, এই সমগ্র রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও মন্তব্য প্রমাণ করে যে পশ্চিমবঙ্গ ক্রমশ এক গভীর ভাবাদর্শগত ও সাংস্কৃতিক মেরুকরণের দিকে এগিয়ে চলেছে। একদিকে যেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাধু-সন্তদের সম্মান এবং সনাতনী সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনা হচ্ছে, অন্যদিকে এর পাল্টা হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ রক্ষার তাগিদও সমানভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। এই রাজনৈতিক দ্বৈরথ আসন্ন দিনগুলিতে বাংলার নির্বাচনী ময়দানকে আরও বেশি উত্তপ্ত ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে তুলবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

অন্যান্য প্রতিবেদন.