রাস্তায় শিক্ষকরা, ফের আন্দোলন মুখর বিকাশভবন চত্বর

৮ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​শারদোৎসবের আনন্দ ও আলোকমালার হাতছানি যখন গোটা রাজ্যকে এক উদযাপনের মেজাজে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে, ঠিক তখনই বাংলার শিক্ষা মানচিত্রের অন্য পিঠে ফুটে উঠছে এক গভীর হতাশা ও অনিশ্চয়তার ছবি। সর্বস্তরের মানুষ যখন পুজোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন বিকাশ ভবনের সামনে অবস্থান বিক্ষোভে সামিল হয়েছেন রাজ্যের হাজার হাজার কম্পিউটার শিক্ষক। ইনফরমেশন কমিউনিকেশন অ্যান্ড টেকনোলজি (ICT) ফেজ় ৬ ও ৭-এর প্রায় ৩,৭১৯ জন শিক্ষকের মাথার ওপর ঝুলছে ছাঁটাইয়ের খাঁড়া। টেন্ডারের মেয়াদ শেষের অজুহাতে এজেন্সি মারফত কর্মরত এই শিক্ষকদের কাজ থেকে বসিয়ে দেওয়ার নোটিশ বা আশঙ্কা তাঁদের পরিবারকে ঠেলে দিয়েছে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে।


​এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক তীব্র বৈষম্য। আন্দোলনকারী শিক্ষকদের অভিযোগ, আইসিটি ফেজ় ১ থেকে ৫ পর্যন্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সরকারি চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও, ষষ্ঠ ও সপ্তম ফেজ়ের শিক্ষকরা এখনও ওয়েবেল স্কুল নেট বা এক্সট্রা মার্কসের মতো বিভিন্ন বেসরকারি এজেন্সির অধীনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও পরীক্ষার মান একই ছিল। সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হল, পূর্ববর্তী ফেজ়গুলির শিক্ষকরা যেখানে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত সম্মানজনক বেতন পান, সেখানে এই আধুনিক যুগে এজেন্সির শোষণের শিকার হয়ে ৬ ও ৭ ফেজ়ের শিক্ষকদের হাতে আসে মাত্র ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা। এই বিপুল বেতন-বৈষম্য শুধু তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গুই করছে না, বরং সমকাজে সমবেতনের সাংবিধানিক নীতিকেও চরম উপহাস করছে।

বর্তমান সময়ে ডিজিটাল শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর পাঠক্রম আধুনিক শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ। অথচ স্কুলগুলিতে ছাত্রছাত্রীদের কম্পিউটারের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে ডিজিটাল সাক্ষরতার প্রসার ঘটানোর গুরুদায়িত্ব যাঁদের কাঁধে, সেই শিক্ষককূলই আজ চরম সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার অভাবে ভুগছেন। বারবার মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে স্থায়িত্বকরণের মৌখিক বা নীতিগত আশ্বাস মিললেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। যখনই কোনো বেসরকারি এজেন্সির সঙ্গে সরকারের চুক্তি বা টেন্ডারের মেয়াদ শেষ হয়, তখনই সেই এজেন্সির অধীনস্থ শিক্ষকদের চাকরি বাতিলের খড়্গ নেমে আসে। এখানে কোনো স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা বা প্রভিডেন্ট ফান্ড, স্বাস্থ্যবিমার মতো মৌলিক সামাজিক সুরক্ষা টুকুও নেই।

এই আন্দোলন রাজ্য সরকারের কাছে একটি বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুজোর মুখে হাজার হাজার শিক্ষকের চাকরি যাওয়ার এই ঘটনা সরকারের ‘উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান’-এর বয়ানকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। সরকার একদিকে যখন নানা উৎসবের অনুদান ও প্রচারের কাজে ব্যস্ত , অন্যদিকে তখন রাজ্যের মূল স্তরের শিক্ষকরা পেটের দায়ে রাজপথে রাত কাটাচ্ছেন৷

যদি রাজ্য সরকার প্রকৃত অর্থেই শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও ডিজিটাল করে তুলতে চায়, তবে শিক্ষক সমাজের কাছে তাদের চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করাই হবে সরকারের প্রাথমিক ও নৈতিক কর্তব্য। অন্যথায়, এই পুজোয় বিকাশ ভবনের চত্বরে জ্বলে ওঠা প্রতিবাদের আগুন আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক বিস্ফোরণের রূপ নিতে পারে

​এই সংকটের অবসান ঘটাতে হলে কেবল সাময়িক প্রতিশ্রুতির রাজনীতি দিয়ে কাজ চলবে না। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা। প্রথমত, কোনো মাধ্যম বা বেসরকারি এজেন্সির ওপর নির্ভরতা না রেখে আইসিটি ফেজ় ৬ ও ৭-এর শিক্ষকদের অবিলম্বে সরাসরি সরকারি চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সমকাজে সমবেতন সুনিশ্চিত করে তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে হবে। শিক্ষা এবং শিক্ষক কোনো পন্য নয় যে টেন্ডারের মেয়াদের সঙ্গে তাদের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। যদি রাজ্য সরকার প্রকৃত অর্থেই শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও ডিজিটাল করে তুলতে চায়, তবে শিক্ষক সমাজকে ভয়ের পরিবেশ থেকে মুক্ত করে তাদের চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করাই হবে সরকারের প্রাথমিক ও নৈতিক কর্তব্য। অন্যথায়, এই পুজোয় বিকাশ ভবনের চত্বরে জ্বলে ওঠা প্রতিবাদের আগুন আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক বিস্ফোরণের রূপ নিতে পারে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.