দেশ বদলের লড়াইয়ে বন্ধুত্বের সোপান- মনে করায় ভগৎ সিং-বটুকেশ্বর দত্ত

২১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

সালটা ১৯২৪। কমরেড মীর আবদুল মজীদের বাড়িতে এলেন এক শিখ যুবক৷ লম্বা চুল।তার উপরে মাথায় যত্ন করে পাগড়ি বাঁধা।পাতলা দাড়ি তখনও পুরো চেহারা ঢেকে ফেলেনি। পরনে পায়জামা, শার্ট ও কোট। মিষ্ট স্বভাব। নাম- ভগৎ সিং৷ সেখানে তখন উপস্থিত আরও এক যুবক। বর্ধমানের গ্রাম থেকে উত্তরপ্রদেশের কানপুরে পড়াশোনার সুবাদে পাড়ি জমানো বটুকেশ্বর দত্ত। সেই প্রথম দেখা- ভগৎ সিং আর বটুকেশ্বর দত্তের।প্রথম পরিচয় দ্রুত রূপ নেয় গভীর সখ্য এবং আদর্শগত ঐক্যে।


এরপর দুজনেই যুক্ত হন ‘হিন্দুস্তান সোশালিষ্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’ বা এইচএসআরএ (HSRA)-র সঙ্গে।সেই সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল ভারতবাসী। দুই বন্ধুর ভাবনায় স্পষ্ট ছিল যে, শুধু বিক্ষিপ্ত আন্দোলন বা ব্রিটিশের কাছে ভিক্ষে চেয়ে স্বাধীনতা মিলবে না। দরকার এক সর্বাত্মক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, যা কেবল রাজনৈতিক মুক্তি নয়, আনবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তিও। ভগৎ সিংয়ের বুদ্ধিমত্তা এবং বটুকেশ্বর দত্তের সাংগঠনিক দক্ষতা- দুই মিলে তৈরি হয় এক অনন্য বিপ্লবী যুগলবন্দি। বোমা তৈরির কৌশল শেখা থেকে শুরু করে দলের গোপন নথি ও ইস্তেহার প্রচার— বি.কে দত্ত আর ভগৎ সিং জুটি হয়ে উঠল অপ্রতিরোধ্য।

সংগ্রামী ভগত সিং


১৯২৯ সাল৷ ব্রিটিশ সরকার ‘পাবলিক সেফটি বিল’ এবং ‘ট্রেড ডিসপুট বিল’ এর মতো একের পর এক দমনমূলক আইন পাশ করানোর চেষ্টায় রত৷ তখন দেশবাসীর ঘুম ভাঙাতে এক চাঞ্চল্যকর পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেন বিপ্লবীরা। ফরাসি anarchist বা নৈরাজ্যবাদী বৈলেয়ন্টের পন্থায় অনুপ্রাণিত হয়ে ভগৎ সিং প্রস্তাব করেন যে, এমন একটি আঘাত হানতে হবে যা কাউকেই হত্যা করবে না, কিন্তু সরকারের বধির কানে ঠিকই পৌঁছে যাবে।


১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল। দিল্লির সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির দর্শনার্থী গ্যালারি থেকে অধিবেশন চলাকালীন নিচে দুটি বোমা নিক্ষেপ করেন ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত। পরিকল্পনা মাফিক বোমাগুলো এমন জায়গায় ফেলা হয়েছিল যাতে কোনো প্রাণহানি না ঘটে। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট —” If the deaf are to hear, the sound has to be very loud” অর্থাৎ বধিরকে শোনাতে হলে আওয়াজটা জোরে প্রয়োজন । বিস্ফোরণের পর ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারপাশ। পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ঘটনাস্থল ত্যাগ করেননি দুই সংগ্রামী। এই ধোঁয়ার মধ্যে থেকে কিছুক্ষণ পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে দুটি মুখ, ভগৎ সিং আর বটুকেশ্বর৷ আকাশে ওড়াতে থাকেন লাল ইস্তেহার, কন্ঠে গর্জে ওঠে- “ইনকিলাব জিন্দাবাদ!”

তৎকালীন সংবাদপত্রের পাতা


গ্রেপ্তার হন দুই তরুণ৷ আর অভূতপূর্ব ভাবে আদালতকে ব্যবহার করেন বিপ্লবের প্রচারমঞ্চ হিসেবে। ​লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় ভগৎ সিংয়ের ফাঁসি হলেও বটুকেশ্বর দত্তের ভাগ্যে জোটে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্তু জেলের ভেতরেও দুই বন্ধুর লড়াই থামেনি। ব্রিটিশ রাজবন্দি আর ভারতীয় রাজনৈতিক বন্দিদের মধ্যে চলা অমানবিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁরা গড়ে তোলেন ঐতিহাসিক অনশন আন্দোলন। একটানা ১১৪ দিন ধরে চলা সেই অনশনে লড়েছিলেন তাঁরা। ব্রিটিশ জেলের অকথ্য নির্যাতন, জোর করে নল দিয়ে খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা—কোনো কিছুতেই দুই বন্ধুর বিপ্লবী মনোবল ভাঙা যায়নি। যতীন দাসের আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন ভারতীয় কারাবন্দিদের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে থেকে যায় আজওএক মাইলফলক হয়ে।

বটুকেশ্বর দত্ত


ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত প্রমাণ করেছিলেন যে বিপ্লব কোনো সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ নয়, বরং তা হলো আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির মুক্তি ও সাম্যবাদের পক্ষে এক অকুণ্ঠ অবস্থান। তাঁরা দেশকে কেবল পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে চাননি, বরং দিয়ে গেছিলেন উত্তরকালের স্বাধীন ভারতের রূপরেখা কেমন হবে, তারও এক সমাজতান্ত্রিক দিশা।
ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো, ভগৎ সিং শহীদের অমরত্ব লাভ করলেও, যাবজ্জীবন কাটিয়ে এবং যক্ষ্মা রোগে ভুগে যখন বটুকেশ্বর দত্ত মুক্ত হলেন, স্বাধীন ভারত তাঁকে যোগ্য সম্মান দিল না। ১৯৬৫ সালের ২০ জুলাই, দিল্লির এক হাসপাতালে চরম অবহেলায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুর পর তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী পাঞ্জাবের হুসেইনিওয়ালায় ভগৎ সিংয়ের ঠিক পাশেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।


আজকের এই বিশ্বাসহীনতার সময় দাঁড়িয়ে, যখন বন্ধুত্বের রদবদল ঘটে পরতে পরতে৷ যখন অবিশ্বাস আর হিংসার বিষবাষ্পে ঢেকে যায় আসমুদ্রহিমাচল- তখন বটুকেশ্বর দত্ত ও ভগৎ সিংয়ের এই রাজনৈতিক সখ্য আমাদের শেখায় বন্ধুত্ব কেবল ব্যক্তিগত ভালোলাগার নয়, তা হলো দেশপ্রেম, ত্যাগ এবং একটি শোষণহীন সমাজ গড়ার যৌথ প্রতিজ্ঞা। ইতিহাস হয়তো কখনো কখনো কোনো কোনো নায়ককে প্রদীপের নীচের অন্ধকারের মতো আড়ালে রাখে, কিন্তু তাঁদের আদর্শের আলো চিরকাল নতুন প্রজন্মকে পথ দেখায়।

অন্যান্য প্রতিবেদন.