“হম নারী হ্যাঁয়, কোই ঔর নহি। অরত হ্যাঁয়, পর কমজোর নহি।”—উত্তরপ্রদেশের গ্রামীণ জনপদে প্রতি রবিবার সবুজ শাড়িতে সজ্জিত একদল নারীর লাঠি হাতে মার্চ করার দৃশ্য নজরে এসেছে সম্প্রতি৷ যা এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তার জন্ম দিয়েছে। গার্হস্থ্য হিংসা, মদ্যপান, জুয়াখেলা এবং সমাজজীবনকে গ্রাস করা নানা কুপ্রথার বিরুদ্ধে এই নারীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। শিরোনামে উঠে আসা উত্তরপ্রদেশের এই ‘গ্রিন আর্মি’ বা সবুজ বাহিনী আজ ভারতের তৃণমূল স্তরের রাজনীতিতে নারী শক্তির এক নতুন রূপরেখা তুলে ধরেছে।
উত্তরপ্রদেশের বারাণসী ও তার আশেপাশের গ্রামীণ অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের শেকড় লুকিয়ে রয়েছে চরম দারিদ্র্য, সামাজিক অবহেলা এবং পারিবারিক নির্যাতনের দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যে। সমাজে যখন রাষ্ট্রযন্ত্র বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো গৃহস্থালির অন্দরের নির্যাতন বা গ্রামীণ অপরাধের সুরাহা করতে ব্যর্থ হয়, তখন এই নারীরা নিজেদের অধিকার ও সুরক্ষার তাগিদে নিজেরাই রাজনীতির পরিসর তৈরি করে নেন। মূলত দলিত, অনগ্রসর শ্রেণি এবং উপজাতীয় সম্প্রদায়ের নারীরাই এই ‘গ্রিন আর্মি’র মূল চালিকাশক্তি। দীর্ঘদিন ধরে মুখ বুজে সহ্য করা নীরবতাকে ভেঙে তাঁরা যখন জনসমক্ষে প্রতিবাদ জানান, তখন তা এক বৃহৎ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে— যেখানে ব্যক্তিগত দুর্দশাকে সমষ্টিগত রাজনৈতিক লড়াইয়ে রূপ দেওয়া হয়।

‘সবুজ শাড়ি’ এবং ‘লাঠি’ – এই আন্দোলনের প্রতীক৷ অতীতে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থায় ‘গুলাবি গ্যাং’-এর মতো নারীভিত্তিক প্রতিবাদ আমরা দেখেছি, যেখানে গেঞ্জি বা গোলাপি রঙের পোশাক প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। গ্রিন আর্মির ক্ষেত্রেও সবুজ শাড়ি অপরাধী ও সমাজবিরোধীদের কাছে একটি পূর্বঘোষিত সতর্কবার্তা। জুয়ার আড্ডা ভেঙে দেওয়া বা মদ্যপদের প্রকাশ্যে নিবৃত করার মধ্যে রয়েছে এক ধরনের বিকল্প নৈতিক ও সামাজিক শাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। রাষ্ট্র যখন সামাজিক অপরাধ দমনে উদাসীন বা শ্লথ, তখন এই নারীদের লাঠিসোঁটা নিয়ে রাস্তায় নামা এক বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করে।
গ্রিন আর্মির রাজনীতি কেবল পুরুষতান্ত্রিক অত্যাচার বা মদের আসরের বিরোধিতাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাল্যবিবাহ, যৌতুক প্রথা এবং কন্যাসন্তান জন্মের পর উদযাপনের মতো সংস্কৃতি পরিবর্তনেরও লড়াই। এই আন্দোলন অনুধাবন করেছে যে, কেবল পুরুষদের শাসন করে বা ভয় দেখিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়, যদি না নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হন। তাই সেলাই প্রশিক্ষণ বা কুটির শিল্পের মতো জীবিকামুখী উদ্যোগগুলোর সঙ্গে এই আন্দোলনক নিজেকে যুক্ত করার প্রচেষ্টা করে চলেছে৷ আর্থিক নির্ভরতাই যে পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার প্রধান চাবিকাঠি, তা এই নারীরা খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করেছেন।
উত্তরপ্রদেশের গ্রিন আর্মির এই পথচলা আমাদের শিখিয়ে দেয় যে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের সুফল কেবল শহুরে জীবনে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ঘরের কোণের নিপীড়িত নারী যখন দলবদ্ধ হয়ে সমস্বরে বলে ওঠেন—“আমরা দুর্বল নই”—তখনই সমাজ বদলায় , বদলায় দেশ৷

