“আমাদের ব্যথা কেতাবেতে লেখা, পড়িলেই বোঝা যায়;
যে লেখে বেদনা বে-বুঝ বাঁশীতে কেমনে দেখাব তায়?”
-জসীমউদ্দিন
বর্ণমালা,আমার দুঃখিনী বর্ণমালা৷ বর্ণমালার কোনো দেশ হয় না৷ ভাষার কোনো ধর্ম হয় না৷ ভাষা কেবল মানুষের বেঁচে থাকার, অনুভূতির এবং ভাব প্রকাশের শাশ্বত বাহন। শিশুর বলা প্রথম তুর্কি শব্দ- ” বাবা”৷ মায়ের ঘুমপাড়ানিয়া গানের সেই বর্গী বা খাজনা কোনোটাই বাংলা শব্দ নয়৷ রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভারততীর্থ কবিতায় বলেছিলেন –
“রণধারা বাহি জয়গান গাহি উন্মাদকলরবে; ভেদি মরুপথ গিরিপর্বত যারা এসেছিল সবে
তারা মোর মাঝে সবাই বিরাজে, কেহ নহে নহে দূর; আমার শোণিতে রয়েছে ধ্বনিতে তার বিচিত্র সুর।”
ভারতবর্ষ তো মিশ্র সংস্কৃতির দেশ৷ তার ভাষাতেও তাই রয়েছে সেই বিচিত্রিতা, সেই মিশ্রতা৷ ভাষার কোনো সীমান্ত নেই৷ ভূগোল দিয়ে ভাষাকে খণ্ডিত করা যায় না। রাজনৈতিক মানচিত্র হয়তো বাংলাকে দু’ভাগে ভাগ করেছে—, কিন্তু মনের মানচিত্রে বাংলা ভাষা অখণ্ড।
কিন্তু আজ হঠাৎ করে বাংলাভাষায় থাকা আরবি-ফারসি-তুর্কি শব্দ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ৷ সাম্প্রতিক সময়ে পাঠ্যপুস্তক থেকে ‘আম্মা’, ‘আসমান’, ‘নাস্তার’ মতো বহুল ব্যবহৃত ও সহজলভ্য শব্দ বাদ দেওয়া নিয়ে শুরু হয়েছে তরজা৷ অভিযোগ তোলা হয়েছে, শব্দগুলি নাকি ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মুসলিম তোষণের’ অঙ্গ। বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে—প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে শিশুদের স্বাভাবিক পঠনপাঠনের ভাষা কী হওয়া উচিত। একপক্ষের মতে, যে শব্দগুলি বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতিতে বা সর্বস্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে প্রাত্যহিক নয়, সেগুলিকে বিশেষ উদ্দেশ্যে পাঠ্যবইয়ে ঢুকিয়ে একধরনের ভাষিক ও সামাজিক বিভাজন তৈরি করা হয়েছে। সমালোচকদের একাংশের দাবি, ‘মা’-এর বদলে ‘আম্মা’ বা ‘আকাশ’-এর বদলে ‘আসমান’ ব্যবহার করার মাধ্যমে শিশুমনকে একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতির দিকে চালিত করার প্রচেষ্টা হয়েছিল।
অন্যদিকে, শিক্ষাবিদ ও ভাষাতত্ত্ববিদদের একটি বড় অংশের মতে, ভাষা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ মিলিয়ে যে বৃহৎ বাংলা ভাষা বলয়, সেখানে ‘আম্মা’ বা ‘নাস্তা’ অত্যন্ত সাধারণ ও প্রচলিত শব্দ। ভৌগোলিক বা সামাজিক বৈচিত্র্যকে পাঠ্যবইয়ে জায়গা দেওয়া যদি অপরাধ হয়, তবে তা ভাষার বহুত্ববাদী চরিত্রকেই অস্বীকার করে। তা ছাড়া, ‘সরকার’ শব্দটি নিজেই ফারসি, যা প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে বসে রয়েছে।
মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের সাহিত্য- সর্বত্র এই মিশ্রণ । জসীমউদ্দীনের ‘নক্সী কাথার মাঠ’ বা ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’-এ যে গ্রামীণ জনপদের ছবি ফুটে ওঠে, সেখানে মাটি ও মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় এই আম্মা, আসমান, দোস্ত শব্দগুলি। প্রমথ চৌধুরী তার প্রবন্ধে বলেছেন – ‘ফারসী আরবী ছেঁটে দিলে বাঙ্গলা ভাষা বলে কোন একটা ভাষাই থাকে না।’ বাংলা ভাষায় এমন কিছু আরবি, ফারসি শব্দ দীর্ঘদিন চলে আসছে যাদের বাদ দিলে কথা বলাই বন্ধ করে দিতে হয়। প্রমথ চৌধুরী বলেন — ‘কাণ্ডজ্ঞানরহিত হিন্দু সাহিত্যিক থাকেন, যিনি ফারসীর পরিবর্তে তার সংস্কৃত প্রতিশব্দ ব্যবহার করতে চান, তাহলে তাঁকে বলি সংস্কৃত ভাষায় সে জাতীয় প্রতিশব্দ নেই।’- শিরোনাম-‘বাঙ্গলা ভাষায় আরবী ফারসী শব্দ’, বুলবুল- ১৩৪১ বঙ্গাব্দ।
যখনই কোনো রাজনৈতিক শক্তি ভাষার মধ্যে শুদ্ধতা বা ভেদাভেদের জিগির তোলে, তখন তারা মূলত ভাষাটির শিকড়কেই কাটতে চায়।ভাষার পরিবর্তন একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। যুগের প্রয়োজনে নতুন শব্দ যেমন প্রবেশ করে, তেমনই কিছু শব্দ হারিয়ে যায়। কিন্তু তা জনমতের চাপে বা রাজনৈতিক হীনম্মন্যতায় নয়, বরং স্বাভাবিক বিবর্তনের মাধ্যমে ঘটে। যখন ‘তোষণ’ বা ‘তুষ্টির’ ধুয়ো তুলে শব্দের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, তখন তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর সরাসরি আঘাত হানে।
বাংলা ভাষার প্রাণশক্তি তার উদারতায়। একে কোনো বিশেষ ধর্মীয় পরিচয়ে গণ্ডিবদ্ধ করা মানে এর সর্বজনীন চরিত্রকে অস্বীকার করা। ‘বাবা’, ‘আম্মা’, ‘আসমান’, ‘নাস্তা’—এই শব্দগুলি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নয়, এগুলি সাড়ে সাত কোটি বাঙালির জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য দলিল। রাজনৈতিক ডামাডোলে এই শব্দগুলিকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা আসলে জনমানসে বিভাজনের বীজ বপন করার একটি গভীর চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইতিহাস সাক্ষী আছে, ভাষার এই বহুত্ববাদী চরিত্রকে অতীতেও কেউ রোধ করতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ ও জসীমউদ্দীনের রক্তে-মননে যে ভাষা ঋদ্ধ হয়েছে, তা সংকীর্ণ রাজনীতির বেড়া ভেঙে নিজস্ব মহিমায় অনন্তকাল বয়ে চলবে।

