একচালা থেকে প্রতিমার রিয়েলিস্টিক রূপ: জি সি পালকে আজকের সজল ঘোষরা কীভাবে নিতেন?

১০ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

কলকাতার দুর্গাপুজো আজ কেবল ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক উৎসবের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বাংলার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম বড় প্রদর্শনক্ষেত্র। এই উদযাপনের কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিমা শিল্প এবং তার নান্দনিক রূপান্তর। কুমারটুলির কিংবদন্তি মৃৎশিল্পী জি সি পাল (গোরাচাঁদ পাল ও তাঁর উত্তরসূরিরা) একচালা থেকে প্রতিমার যে রিয়ালিস্টিক বা বাস্তবধর্মী রূপের পথপ্রদর্শক ছিলেন, তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী।


​সাবেকিয়ানা ও আধুনিকতার প্রতীকী মেলবন্ধন ঘটে জি সি পালের শিল্পে। জি সি পালের শিল্পশৈলীর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সাবেকি প্রতিমার ক্লাসিক্যাল আভিজাত্যের সঙ্গে আধুনিক anatomy বা বাস্তবধর্মী অবয়বের নিপুণ সংযুক্তি। একচালার সাবেকি কাঠামো থেকে যখন প্রতিমা ধীরে ধীরে ত্রিমাত্রিক ও জীবন্ত রূপ পেতে শুরু করে, তখন তা সাধারণ মানুষের আবেগ এবং চাক্ষুষ সন্তুষ্টিকে এক সুতোয় বাঁধে। সজল ঘোষের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা, যাঁরা মূলত হেভিওয়েট ও জনবহুল থিম পুজোর সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের কাছে এই শিল্প নিছক মাটির পুজো নয়। এটি হলো গণসংযোগ ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এক শক্তিশালী দৃশ্যমাধ্যম। সাবেকিয়ানার আবেগ এবং আধুনিক রিয়ালিস্টিক রূপের এই সংমিশ্রণকে তাঁরা সনাতনী সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন হিসেবে দেখেন, যা সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে সহজে রেখাপাত করে।

জি সি পালের তৈরী ষাটের দশকের একটা থিমের দুর্গা প্রতিমা


​
​আজকের দিনে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে যে বিশাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে, সজল ঘোষরা তাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন। জি সি পালের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পীদের হাতের কাজ এবং তাদের উত্তরসূরিদের গড়া প্রতিমার ডিটেলিং বা নিখুঁত রূপায়ন মণ্ডপের থিম ও রাজনীতির মূল ভাষাকে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে। সজল ঘোষদের রাজনৈতিক দর্শনে সনাতন ধর্মের গৌরব এবং বাঙালি সংস্কৃতির ক্যানভাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিমার সেই চিরায়ত অথচ আধুনিক অভিব্যক্তি রাজনৈতিক মঞ্চের আড়ম্বর ও আক্রমণাত্মক হাইপকে একটা সাংস্কৃতিক বৈধতা ও গাম্ভীর্য এনে দেয়।

​সজল ঘোষের মতো নেতারা যখন সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের মতো পুজোয় প্রযুক্তির ব্যবহার, থিম বা হাই-ভোল্টেজ রাজনৈতিক বার্তা সামনে নিয়ে আসেন, তখন তার কেন্দ্রে থাকে জনসমুদ্র আকর্ষণ করার কৌশল। জিসি পালের ঐতিহ্যবাহী রিয়ালিস্টিক প্রতিমা শিল্প এই জমকালো আয়োজনের মধ্যে একটি শৈল্পিক ভারসাম্য রক্ষা করে। সজল ঘোষরা এই শিল্পীদের দু’চোখে দেখেন এমন এক শক্তির উৎস হিসেবে, যা তাঁদের রাজনৈতিক ইভেন্টকে শুধু নিছক রাজনৈতিক সভা না বানিয়ে একটি আবেগঘন জনউৎসবে পরিণত করে। এখানে প্রতিমা কেবল উপাস্য নন, বরং তা ক্ষমতার প্রদর্শন এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী হাতিয়ার।
​
​সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুজো যত কর্পোরেট এবং রাজনৈতিক ময়দানে পরিণত হয়েছে, ততই জি সি পালের মতো শিল্পীদের ঐতিহ্যগত শ্রম এবং রাজনীতিকদের প্রদর্শনীমূলক সদিচ্ছার মধ্যে একটা অদৃশ্য সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সজল ঘোষরা মুখে সংস্কৃতির রক্ষার কথা বললেও, তাদের কাছে প্রতিমা বা মণ্ডপশিল্প অনেক সময় রাজনৈতিক বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম। তবে জিসি পালের শিল্পশৈলীর যে শেকড়মুখী সত্যতা এবং নান্দনিক ব্যঞ্জনা, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনীতিকরা খুব ভালো করেই বোঝেন যে, মানুষের ভিড় টানে সেই নিখুঁত শৈল্পিক প্রতিমা, যার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন জিসি পালের মতো মাস্টার কারিগররা।

জি সি পালের তৈরী কালীমূর্তি

সংক্ষেপে বলতে গেলে, সজল ঘোষদের মতো প্রখর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা জিসি পালের প্রতিমা শিল্পকে দেখেন তাঁদের রাজনীতির এক নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক বর্ম হিসেবে। সাবেকিয়ানা ও রিয়ালিজমের যে মেলবন্ধন জি সি পাল বাংলা প্রতিমা শিল্পে দিয়ে গেছেন, তাকে সজল ঘোষরা তাদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি, জনসমর্থন এবং সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের প্রচারের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করে চলেছেন। শিল্প এবং রাজনীতির এই মেলবন্ধনই বর্তমান কলকাতার দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।
​

অন্যান্য প্রতিবেদন.