সরকার এত রেগে আছে কেন?

৭৩ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

নয় সেপ্টেম্বর গোলপার্ক থেকে যাদবপুর বিশ্ব বিদ্যালয়ের দিকে ‘গেরুয়া সম্মান যাত্রা’। মিছিলের সামনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। যাদবপুরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি’ কিংবা কিষেণজি কে ‘রেড স্যালুট’ দেওয়া লোকেদের তিনি ‘শিকড় থেকে উপড়ে ফেলবেন’। খুব ভালো কথা! গণতন্ত্রে যদি একজন মুখ্যমন্ত্রীর ভাষাই ‘উপড়ে ফেলব’ হয়, তা হলে আর কী বলব? এর আগেও মুখ্যমন্ত্রী যাদবপুর প্রসঙ্গে ‘কড়া ওষুধ’-এর কথা বলেছিলেন। পরদিন উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী বিধানসভায় এমন একটি বিল পেশ করলেন, যা সরকারকে এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের বদলি করার ক্ষমতা দেয়। বিধানসভা শেষ পর্যন্ত সেই বিল পাশও করেছে। সরকার বলছে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে অভিজ্ঞ শিক্ষক-কর্মী পাঠাতে এই ব্যবস্থা দরকার। শিক্ষক সংগঠনগুলি বলছে, এই ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন ও চাকরির নিরাপত্তায় আঘাত করতে পারে।আপনি চাইলে ঘটনা দুটোকে আলাদা করে দেখতে পারেন। কিন্তু মানুষের মাথার ভিতরের চিন্তাকে এভাবে আলাদা করবেন কী করে? আপনি আকাশের দিকে গুলি ছুড়ে কি গুলির শব্দকে আকাশ থেকে আলাদা করতে পারবেন? পারবেন না। শব্দটা আকাশ জুড়েই ছড়াবে। ধরুন, একজন অধ্যাপক বুধবার শুনলেন, মুখ্যমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশকে ‘উপড়ে ফেলবেন’ বলছেন। বৃহস্পতিবার তিনি জানলেন, সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মীদের অন্যত্র বদলি করতে পারবে। শুক্রবার ক্লাসে ঢুকে সরকারের সমালোচনা তো দূরের কথা, নিজের স্বাধীন মত প্রকাশ করতেই যদি তিনি ভয় পান, তাঁকে খুব দোষ দেবেন কী করে? আমার মনে হয়, গণতন্ত্রের অন্ধকার যাত্রা ঠিক এখান থেকেই শুরু হয়। পুলিশ তাঁর বাড়িতে গেল না, প্রশাসন কোনও নোটিস পাঠাল না, কেউ তাঁকে চুপ করতেও বলল না। তিনি নিজেই ভাবলেন, থাক, কী হবে কথাটা বলে! জীবনানন্দের ভাষায়, “কে হায় হৃদয় খুঁড়ে / বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!” শাসক ঠিক এইখানেই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পান। রাগ দেখিয়েই যদি ভয় ধরানো যায়, তা হলে হকার হোক, টোটো চালক হোক, রেস্তরাঁর মালিক হোক কিংবা সরকারি কর্মচারী—কাউকে আর আলাদা করে চুপ করাতে হবে না। মানুষ নিজেই নিজের গলার আওয়াজ কমিয়ে নেবে। সামনে আবার পুজো; ফলে এই ভয়ের পরিধি কত দূর যাবে, সেই প্রশ্নও থেকেই যায়।

তাই প্রশ্নটা আমি সরাসরি করছি—সরকার এত রেগে আছে কেন? কেউ আইন ভাঙলে পুলিশ তাকে ধরবে। বিচ্ছিন্নতাবাদী বা অন্য কোনও বেআইনি কাজের প্রমাণ পেলে পুলিশ মামলা করবে। আদালত তার বিচার করবে। রাষ্ট্র আইনে চলে। কিন্তু আইন আর রাগ কি এক জিনিস? উত্তর—না। বিরোধী নেতা ‘দেখে নেব’ বললে সেটা রাজনৈতিক আস্ফালন। মুখ্যমন্ত্রী একই কথা বললে তাঁর কথার পাশে পুলিশ, প্রশাসন, মামলা, বদলির ক্ষমতা—গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র এসে দাঁড়ায়। তাই মুখ্যমন্ত্রীর মুখের কথা নিছক কথা নয়। কখনও সেই কথা ঘোষণার চেহারা নেয়। শাসক তখন একটা নতুন বয়ান তৈরি করেন।

সেই কারণেই ‘উপড়ে ফেলা’ কথাটা আমাদের শুধু অস্বস্তিতে ফেলে না, ভয়ও দেখায়। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, আপনি না হয় আগাছা উপড়ে ফেললেন। কিন্তু মানুষের চিন্তা উপড়ে ফেলবেন কী করে? একেবারে নির্মূল করবেন? ক্ষমতায় থাকা মানুষ মাঝেমধ্যেই এই সহজ কথাটা ভুলে স্বেচ্ছাচারী ভাষায় কথা বলেন। আপনার কোনও মত পছন্দ না হলে তার বিরোধিতা করুন, যুক্তি দিয়ে আক্রমণ করুন, নির্বাচনে হারান, কেউ আইন ভাঙলে তাকে শাস্তি দিন। কিন্তু আপনি যখন মানুষকে আগাছার অভিধানে ঢুকিয়ে দেন, তখন আর তাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভাবেন না; শত্রু ভাবতে শুরু করেন। তার পরে বিরুদ্ধ মতের মানুষকে ‘দেশদ্রোহী’, ‘উন্নয়ন বিরোধী’ বা অন্য কোনও ছাপ দিয়ে সমাজের চোখে আলাদা করে দেন। সেখান থেকেই গণতন্ত্রের ব্যাকরণ বদলাতে শুরু করে।

হান্না আরেন্ট লিখেছিলেন, “Power and violence are opposites.” কথাটা খুব সোজা। মানুষের সম্মতি শাসককে ক্ষমতা দেয়। জবরদস্তি মানুষের কাছ থেকে আনুগত্য আদায় করে, সম্মতি নয়। শাসক যখন প্রতিটি অমত কে শক্তি দেখিয়ে সামলাতে চান, তখন প্রশ্নটা তাঁর দিকেই ফিরে আসে—তিনি কি মানুষের সম্মতির উপর ভরসা হারাচ্ছেন? সরকারের কি নিজের কাজের উপর যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস নেই? আত্মবিশ্বাসী শাসক সব সময় চিৎকার করেন না, প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে ধমকও দেন না। রাগ অনেক সময় শক্তির চিহ্ন নয়, নিরাপত্তাহীনতার লক্ষণ।

এই রাগ যদি একদিন প্রশাসনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়, সাধারণ মানুষ আর বুঝতে পারেন না সীমাটা কোথায়। প্রথমে সরকার বলে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর হব। খুব ভালো কথা। তারপর বলে, রাষ্ট্রবিরোধী দের বিরুদ্ধে কঠোর হব। সরকার যদি আইন মেনে কাজ করে, তাতেও আপত্তি নেই। গোলমাল শুরু হয় তার পরে। সরকার যখন নিজেই ঠিক করতে শুরু করে কে রাষ্ট্রবিরোধী, কে দেশপ্রেমিক, কে দেশদ্রোহী, তখন খেলাটা বদলে যায়। সরকার নিজের বিরোধিতা কেই রাষ্ট্রের বিরোধিতা বলে চালাতে শুরু করে। দলীয় কর্মীর কাছে মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা মানে বাংলার অপমান, প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা মানে দেশের অপমান। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপরীত মতের চর্চাকে তারা ষড়যন্ত্র বলে দেখে, শিল্পীর স্বাধীনতাকে প্ররোচনা বলে। আইন তখনও বইয়ের পাতায় থাকে, কিন্তু শাসকের রাগ ঠিক করে দেয় প্রশাসন সেই আইন কার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করবে।

আম্বেদকর গণপরিষদে বলেছিলেন, “Constitutional morality is not a natural sentiment. It has to be cultivated.” কথাটা শুধু সংবিধানের বই নিয়ে নয়, ক্ষমতার চরিত্র নিয়েও। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো একটা কথা বারবার ভুলে যায়—গণতন্ত্রের পরীক্ষা ভোটের দিন শেষ হয় না; বরং সেদিন থেকেই আসল পরীক্ষা শুরু। ক্ষমতায় বসে শাসক নিজের হাত কতটা বেঁধে রাখতে পারেন, নিজের অপছন্দের মানুষের অধিকার কতটা রক্ষা করেন, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমালোচনা কতটা সহ্য করেন—এই আচরণই তাঁর সাংবিধানিক নৈতিকতার পরিচয় দেয়।

পশ্চিমবঙ্গে এই রোগ আমরা আগেও দেখেছি। দীর্ঘ শাসনের শেষ দিকে মানুষ বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে দল ও প্রশাসনের সীমা মুছে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিল। তৃণমূলের আমলে ও মানুষ বারবার প্রশ্ন করেছে, শাসক দল আর রাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্বটা কোথায়? নতুন সরকার যদি পুরনো সরকারের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে তারই গলার স্বর, তারই দাপট, তারই ‘আমরাই ঠিক করে দেব’ মানসিকতা ধার করে, তা হলে বদলটা হল কোথায়? পতাকার রং বদলালেই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায় না। তা হলে কি ধরে নেব, শুধু ধমক দেওয়ার মালিক বদলেছে?

নীরদচন্দ্র চৌধুরীর ভাষা ধার করে ‘আত্মঘাতী বাঙালি’ বলে ভোটারকে দোষ দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু তাতে আসল প্রশ্ন চাপা পড়ে না। নাগরিক সরকার নির্বাচন করেন। তার পরে সেই সরকার কীভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করবে, তার দায় সরকারকেই নিতে হবে। আত্মঘাতী বরং সেই রাজনৈতিক শক্তি, যে জনসমর্থন কে নিঃশর্ত আনুগত্য বলে ভুল বোঝে, যে প্রশ্নকে অবাধ্যতা ভাবে, সমালোচনাকে অপমান ভাবে, বিরোধিতাকে ষড়যন্ত্র ভাবে। এই ভুলের ফল প্রথমে খুব একটা চোখে পড়ে না। ভয়ের পরিবেশ তৈরি হলে ছাত্র একটু কম কথা বলে, শিক্ষক বাক্য মেপে বলেন, সাংবাদিক শিরোনাম লেখার আগে সংসারের কথা ভাবেন, আমলা খারাপ খবর মন্ত্রীর টেবিলে পাঠাতে ইতস্তত করেন। নিজের দলের লোকও আর নেতাকে বলেন না—আপনি ভুল করছেন। কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের এক শিবির থেকে অন্য শিবিরে ছোটা ছুটি ও কোনও সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়। নিস্তব্ধতা আর আনুগত্যের প্রতিযোগিতা একসঙ্গে বাড়লে সরকারেরই সাবধান হওয়া উচিত।

তারপর একদিন শাসক চারদিকে তাকিয়ে দেখেন, সবাই তাঁর সঙ্গে একমত। আসলে সেই দিন থেকেই তাঁর সবচেয়ে খারাপ সময় শুরু হয়। অথচ তিনি বিপদটা টের পান না। কেউ আর তাঁকে অপ্রিয় সত্যি বলতে চায় না। প্রশাসন বাস্তবের বদলে তাঁর পছন্দের খবর দেয়, পুলিশ খারাপ খবরের ধার কমিয়ে রিপোর্ট লেখে, দলের নেতারা মানুষের ক্ষোভের বদলে হাততালির শব্দ শোনান। শাসক ভাবেন, সব শান্ত, সব আন্ডার কন্ট্রোল, সনাতনী দের সুবর্ণযুগ। কিন্তু নীরবতা কি সব সময় শান্তি দেয়? না।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন – “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর। আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী। বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,”

এই চারটি লাইন আজ শুধু মঞ্চে আবৃত্তি করলে চলবে না। রাষ্ট্রকে ও বারবার শুনতে হবে। তা না হলে আমরা বাংলাকে কোথায় নিয়ে যাব? ইতিহাস পড়াতে গিয়ে শিক্ষককে ভাবতে হবে—আমি ঠিক বললাম তো, সরকার রাগ করবে না তো? সাংবাদিক প্রশ্ন করার আগে ভাববেন—দিনের শেষে আমাকেও সংসার চালাতে হবে। নাট্যকার, অভিনেতা, শিল্পী নিজের কাজ শুরু করার আগে ভাববেন—কী দরকার, যা হচ্ছে হোক। সাধারণ মানুষ একটা বাক্য লেখার আগেও হিসেব করবেন—এর জন্য বিপদ হবে না তো? এর সঙ্গে যদি চাকরির অনিশ্চয়তা, রোজগারের চিন্তা এবং সরকারি সাহায্য হারানোর আশঙ্কা মিশে যায়, ভয় আরও গভীরে ঢোকে। যে মানুষ অন্নপূর্ণা যোজনা, বার্ধক্য ভাতা কিংবা বিধবা ভাতার মতো সরকারি সহায়তার উপর নির্ভর করেন, তাঁর মনেও প্রশ্ন ঢুকতে পারে—বেশি কথা বললে আমার ক্ষতি হবে না তো? সরকার হয়তো কখনও এমন হুমকি দেয়নি। কিন্তু ভয়ের আসল শক্তি এখানেই; তাকে সব সময় লিখিত নির্দেশ দিতে হয় না। তা হলে পড়ে রইল কী? ভয়। ভয়। ভয়। আর ভয়।

রাজ্যে নির্বাচন হবে, সামনে পঞ্চায়েত ভোট আসবে, বিধানসভা থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, সংবাদপত্র ও বেরোবে। শুধু মানুষ একটু একটু করে নিজের কণ্ঠস্বর ছোট করে ফেলবে। বাইরে সবাই শান্ত থাকবে, ভিতরে মানুষ ভয় নিয়ে বাঁচবে। আর ঠিক এইখানেই আমার মনে পড়ে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পৃথিবী ঘুরছে কবিতার গ্যালিলিওকে – “চোখ রাঙালে না হয় গ্যালিলিও। লিখে দিতেন, ‘পৃথিবী ঘুরছে না।’”

কিন্তু শাসকের চোখরাঙানিতে পৃথিবী ঘোরা বন্ধ করে না। শিক্ষক চুপ করে যেতে পারেন, সাংবাদিক কলম নামিয়ে রাখতে পারেন, শিল্পী অগত্যা নিজের কাজেই কাঁচি চালাতে পারেন। তাতে সত্য বদলায় না। মানুষের মাথায় যে প্রশ্ন একবার জন্ম নেয়, শাসক তাকে এত সহজে উপড়ে ফেলতে পারেন না। মানুষ সরকারকে আইন চালানোর অধিকার দিয়েছে, ঠিকই; কিন্তু মানুষের মাথার ভিতরটা শাসন করার অধিকার দেয়নি।ইতিহাস ক্ষমতাকে বারবার একটাই নিষ্ঠুর শিক্ষা দিয়েছে—যে সরকার নাগরিকের প্রশ্ন উপড়ে ফেলতে চায়, সে একদিন আবিষ্কার করে, নিজের পায়ের তলার মাটিটাই আলগা হয়ে গেছে। তখন আর চোখরাঙানি কাজে আসে না, হুংকার তো নয়ই। পতাকা থাকে, পুলিশ থাকে, মাইক থাকে, সিংহাসনও থাকে। শুধু সরকারের প্রতি মানুষের বিশ্বাসটা আর থাকে না। একদিন শাসক দেখেন, তিনি এখনও সিংহাসনে বসে আছেন। অথচ চারপাশে শুধু একটা বিরাট, অবাধ্য, নিঃশব্দ শূন্যতা।

অন্যান্য প্রতিবেদন.