হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে: গুপ্তিপাড়ার রথ ও এক ‘অতল’ রূপান্তরের প্রেম তত্ত্ব

৬৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

রথযাত্রার কথা শুনলেই আমাদের মন প্রথমেই চলে যায় পুরীতে। চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে সমুদ্রতট, লাখ লাখ মানুষের ভিড়, বিশাল রথের চাকা আর জগন্নাথের রহস্যময় কালো মুখ। কিন্তু এই চেনা ছবি বা ছকের বাইরে বাংলা নিজের হাতে গড়ে তুলেছে আরেকটা রথ-সংস্কৃতির ইতিহাস; যার জীবন্ত উদাহরণ হুগলি জেলার বলাগড় ব্লকের গুপ্তিপাড়ার রথ উৎসব। প্রসঙ্গত এখানে বলে রাখি, গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এটি পুরীর রথযাত্রার সরাসরি নকল নয়; বরং গুপ্তিপাড়ার এই রথযাত্রা আর পুরীর জগন্নাথের রথের প্রধান পার্থক্য হলো, গুপ্তিপাড়া এই উৎসবকে বাংলার নিজস্ব ভাষায়, নিজস্ব জল-আবহাওয়াতে অনুবাদ করে নিতে পেরেছে। তাই সে স্বতন্ত্র, সকলের থেকে আলাদা। এই প্রসঙ্গে প্রথমেই আসল কথাটা বলে নেওয়া ভালো—গুপ্তিপাড়ার মানুষ কিন্তু এই রথকে “জগন্নাথের রথ” বলেন না। তাঁরা বলেন “বৃন্দাবন জীউর রথ”। এই একটা কথাই আমাদের বুঝিয়ে দেয়, গুপ্তিপাড়ার রথ পুরীর রথ থেকে কতটা আলাদা। বলা যায়, গুপ্তিপাড়ার রথ পুরীর রথকে পুরোপুরি কপি করেনি, বরং নিজের মতো করে গড়ে তুলেছে।

রাজার দেবতা, মানুষের ঈশ্বর

এই প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে আমাদের প্রথমেই বুঝতে হবে পুরীর ইতিহাসটাকে। মধ্যযুগের ওড়িশায় পূর্ব গঙ্গ ও পরবর্তী সূর্যবংশীয় রাজারা জগন্নাথ-সংস্কৃতিকে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে বসিয়েছিলেন। রাজা নিজেকে দেবতার মালিক হিসেবে নয়, বরং সেবক হিসেবে দেখাতেন। তাই এখনও রথযাত্রার আগে পুরীর রাজপরিবার রথের পথকে সোনার হাতলযুক্ত ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে; একে বলে ছেরাপহরা। এই আচার দেখায়, ঈশ্বরের সামনে রাজা আর সাধারণ ভক্ত সমান। কিন্তু এর পাশাপাশি জগন্নাথকে ঘিরে পুরীতে গড়ে উঠেছে এক বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক জগৎ। কিন্তু এই বাংলা জগন্নাথকে গ্রহণ করেছে একটু অন্যভাবে। চৈতন্য-পরবর্তী গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলন ঈশ্বরের রাজকীয় ঐশ্বর্যের পাশে বসিয়েছে মাধুর্যকে; অর্থাৎ এখানে মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। শ্রীচৈতন্য পুরীতে জগন্নাথ দর্শন করে যে প্রেমাবেগ অনুভব করে ছিলেন, বৃন্দাবনের ছয় গোস্বামী পরে সেই ভাবকে বৃন্দাবনের কৃষ্ণপ্রেমের সঙ্গে জুড়ে দেন। ঈশ্বর এখানে দূরের কোনো রাজা নন, তিনি আমাদের কাছে সখা, প্রিয় কিংবা কখনো নিজের সন্তানের মতো।

গুপ্তিপাড়ার রথ

গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্র মঠ এই ভাবেরই এক বাস্তব রূপ। মঠের গর্ভগৃহে বৃন্দাবনচন্দ্র ও রাধিকার মূর্তি প্রতিষ্ঠিত, আর তাঁদের ঠিক পেছনে রয়েছেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। রথযাত্রার দিন এই তিন মূর্তিকেই রথে তুলে গুপ্তিপাড়ার বিখ্যাত রথ বের করা হয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৭৪০ সালে স্বামী মধুসূদনানন্দ (কারও মতে পিতাম্বরানন্দ) এই রথযাত্রা শুরু করেন, যদিও কোনো কোনো সূত্রে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নামও এখানে জড়িয়ে আছে। প্রায় কয়েকশো বছর ধরে এই রথ চলছে, আর আজও একে বলা হয় বৃন্দাবন জীউর রথ—কখনোই জগন্নাথের রথ নয়। এই ছোট্ট নামকরণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলার রথ সংস্কৃতির আসল অবস্থান: এখানে মাঠ দখল করেছে বৃন্দাবনের প্রেম, রাজকীয় ঐশ্বর্য নয়। চোখের সামনের রাজকীয় সিংহাসন ছেড়ে তিনি যেন ভক্তের অন্তরে চিরন্তন ঠাঁই নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—
“নয়নসমুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই—
আজি তাই শ্যামলে শ্যামল তুমি, নীলিমায় নীল,
আমার ভুবন আজি তোমার নিখিল।”

মন্দিরের নিয়ম, উৎসবের হুল্লোড়

তবে পুরী আর গুপ্তিপাড়ার পার্থক্যকে ভালো বনাম মন্দ বলে সরল করে দেওয়া ঠিক হবে না। পুরীর মন্দির শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেবায়ত-পরম্পরা আর নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিধি মেনে চলে আসছে। এই বিশাল প্রতিষ্ঠান জগন্নাথকে একই সঙ্গে পরম দেবতা এবং ওড়িশার আঞ্চলিক পরিচয়ের কেন্দ্র করে তুলেছে।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব অনুসারে এই একই আবেগ আমাদের এখানে অন্যভাবে ধরা পড়েছে। রূপ গোস্বামী সংস্কৃতে লিখেছেন ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, আর কৃষ্ণদাস কবিরাজ বাংলায় লিখেছেন শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত। দুটো গ্রন্থের ভাষা আলাদা, কিন্তু দুটোই ভক্তির আবেগ আর ঈশ্বরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের তত্ত্বকে মর্যাদা দেয়। প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস তৈরি করে ঠিকই, কিন্তু গুপ্তিপাড়ার মতো লোকোৎসব সেই প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, হইচই আর উৎসবের অধিকারকেও সমানভাবে জায়গা দেয়—এখানেই গুপ্তিপাড়ার নিজস্বতা।

গুপ্তিপাড়ার সবচেয়ে বিখ্যাত লোকাচার, উল্টোরথের আগের দিন হয় ভাণ্ডার লুট। এর পেছনে একটা রসাল উপকথা প্রচলিত আছে। লক্ষ্মীর সঙ্গে মান-অভিমান হওয়ায় জগন্নাথ নাকি মাসির বাড়িতে লুকিয়ে থেকে যান। লক্ষ্মীর মনে সন্দেহ হয়, স্বামী বুঝি অন্য কোথাও মন দিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, জগন্নাথের মাসির বাড়িতেই থাকার খবর। স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে লক্ষ্মী নিজেও মাসির বাড়ি যান, কিন্তু গিয়ে দেখেন ঘরের তিনটে দরজাই বন্ধ। শেষে বৃন্দাবন আর কৃষ্ণচন্দ্র দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন এবং ঘরভর্তি মালসায় সাজানো খাবার দেখে সবাই মিলে সেই খাবার লুট করে নেন। সেদিন থেকেই এই আচারের নাম ‘ভাণ্ডার লুট’।

এখনো এই ভাণ্ডার লুট প্রতি বছর গুপ্তিপাড়ায় খুব ধুমধাম করে পালন করা হয়। প্রায় বাহান্ন পদের খাবার, চল্লিশ কুইন্টালের কাছাকাছি ভোগ সাড়ে পাঁচশোর বেশি মালসায় সাজানো হয়—যার মধ্যে থাকে খিচুড়ি, বেগুন ভাজা, মালপোয়া, ক্ষীর, রাবড়ি। নির্দিষ্ট আচার শেষ হওয়ার পর মানুষ হুড়মুড়িয়ে সেই ভোগ সংগ্রহ করেন। ভারতবর্ষের আর কোথাও রথযাত্রায় এমন ভাণ্ডার লুট হয় না। আর এই একটা আচার বা নিয়ম গুপ্তিপাড়াকে বাংলার অন্য সব রথযাত্রা থেকে আলাদা করে দিয়েছে। তাই এখানে দেখা যায়, দেবতার রান্নাঘর পুরোহিত দের একচেটিয়া নয়; বরং উৎসবের মুহূর্তে সাধারণ মানুষও তার ভাগীদার হয়ে ওঠেন।

সংস্কৃত থেকে বাংলা পদাবলিতে

ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় তাঁর “বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব” গ্রন্থে দেখিয়েছেন, বাংলার সংস্কৃতিকে বুঝতে গেলে শুধুমাত্র রাজবংশ বা যুদ্ধবিগ্রহকে কেন্দ্রে রেখে বুঝলে হবে না; বরং বুঝতে হবে ভাষা আর জনসমাজের দীর্ঘ মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। কারণ প্রাচীন ভারতে সংস্কৃত ভাষা ছিল উচ্চবর্ণের ভাষা; সংস্কৃত হয়ে উঠেছিল একই সাথে জ্ঞানচর্চা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান ভাষা। আমাদের এখানে বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলনের ফলে জগন্নাথকে কেন্দ্র করে যে আবেগ, তা ধীরে ধীরে বাংলার পদাবলিতে, কীর্তনে আর লোকভাষার জগতে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এর একটি সামাজিকীকরণ ঘটেছে এবং তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলেই গুপ্তিপাড়ার রথ একই সাথে আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতির এক নান্দনিক পীঠস্থানে পরিণত হয়েছে।

সুতরাং গবেষকদের মতে, এই সামাজিকীকরণ বা পরিবর্তন কেবলমাত্র শব্দের বদলে আসেনি, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যেও বদল এখানে লক্ষণীয়। যার ফলে আমরা দেখি বাংলার পদাবলি, নামসংকীর্তন, খোল-করতাল এবং তার ধর্মীয় অভিজ্ঞতা গুলো অনেক বেশি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে গেছে। ফলে গুপ্তিপাড়ার রথও এই বৃহৎ বঙ্গীয় সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে উঠেছে—যেখানে মঠ, মেলা, লোকাচার, খাদ্য আর জনসমাগম একসঙ্গে মিশে এক স্বতন্ত্র ইতিহাস গড়ে তুলেছে। তাই গুপ্তিপাড়ার মানুষের কাছে জগন্নাথ শুধুমাত্র দূরের তীর্থের দেবতা নন; বরং তিনি হয়ে উঠেছেন এলাকার মানুষের স্মৃতি, স্বপ্ন আর ভালোবাসা। ফলে গুপ্তিপাড়ার সাধারণ মানুষের কাছে এই উৎসবের চরিত্র আর পাঁচটা রথের চরিত্র থেকে একদম আলাদা।
তাই এই কারণেই পুরীর রথ আর গুপ্তিপাড়ার রথকে আসল-নকলের দ্বন্দ্ব বা অঙ্কের মাপকাঠিতে ফেলা ঠিক হবে না। বরং এটাকে বিশ্লেষণ করতে হবে ইতিহাসের নিরিখে, লোক ও লোকসংস্কৃতির ধারায়—যেখানে ধর্মীয় প্রতীক এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গেলে নতুন সমাজ তাকে নিজের ভাষা, অভ্যাস ও সংস্কৃতি দিয়ে নিজের মতো করে বদলে নেয়। এই বাংলায় গুপ্তিপাড়ার জগন্নাথের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই ঘটেছে।

রথের দড়িতে জমে থাকা ইতিহাস

সন্ধে নামছে গুপ্তিপাড়ায়। বৃন্দাবনচন্দ্র মঠের সামনে থেকে বাজার পর্যন্ত এক মাইল পথ জুড়ে মেলা বসেছে। সামনে উল্টোরথ, আর হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাঙা হবে মাসির বাড়ির সেই তিনটে দরজা—লক্ষ্মীর অভিমান, জগন্নাথের লুকিয়ে থাকা, আর শেষে হাজার হাজার হাত একসঙ্গে ছুটে যাবে মালসার দিকে। এই দৃশ্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রার আসল গল্প। এখানে ঈশ্বরকে শুধু দূর থেকে প্রণাম করে চলে যাওয়া নয়, নিজের ঘরের অভিমান আর ভালোবাসার ভাষাতেও তাঁকে আরও কাছে ডাকা।

পুরীর জগন্নাথ বাংলায় এসে হারিয়ে যাননি, আবার অবিকল আগের মতোও থাকেননি। বরং যে ঈশ্বর সমুদ্রতীরে রাজার কাছ থেকে সেবা নেন, বাংলায় এসে তিনিই মাসির বাড়িতে লুকিয়ে বসে থাকেন স্ত্রীর অভিমানের ভয়ে। দূরত্ব থেকে আত্মীয়তার দিকে এই যে যাত্রা—এটাই গুপ্তিপাড়া বা বাংলার নিজস্ব সংযোজন। রথের দড়ি তাই আজও টানা হয়—এক ভূখণ্ড থেকে অন্য ভূখণ্ডে, এক ভাষার ঈশ্বর থেকে অন্য ভাষার ঈশ্বরের দিকে; অথচ তা আসলে দূরত্ব থেকে ভালোবাসার দিকে।
এই সেই ভালোবাসা, যা রাজকীয় ঐশ্বর্যের নাগাল এড়িয়ে শেষমেশ ভক্তের মনের অতলে এসে ধরা দেয়। আর সেই পরম অতলতার খোঁজে, ভাগীরথীর তীরের এই মায়াময় লোকোৎসবে এসে যেন মিলেমিশে এক হয়ে যায় জয় গোস্বামীর কবিতার কটি লাইন—
“অতল, তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি ব’লে
হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে

সে-লেখা তুলবে ব’লে
কবি ডুবে মরে, কবি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে।”

অন্যান্য প্রতিবেদন.