ক্রেনশক্তিতে উপড়ে গেলো নেহেরু মূর্তি;কংগ্রেস-বিজেপি-তৃণমূলের ত্রিমুখী তরজা ভারতের শেষ গ্রামে দুর্বিষহ জীবন, পদ্মা নদীর ছন্দেই বাঁচে ওরা! নেই হাসপাতাল, স্কুল, রোজগার! ভাতের বদলে কাফন? ১৯৫৯ সালের যে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে কেঁপেছিল রাইটার্স! আহমেদাবাদের স্টাডি সার্কেলে হামলা; নিষিদ্ধ আনা ফ্রাঙ্ক,মালালা ইউসুফজার! কেন বুদ্ধবাবু পারেননি তসলিমাকে নিরাপত্তা দিতে? কেন বিজেপি ফেরাল? কার দখলে বাংলার বিরোধী রাজনীতি? তৃণমূলের শেষে আশার আলো দেখছে CPIM? কার দখলে বাংলার বিরোধী রাজনীতি? তৃণমূলের শেষে আশার আলো দেখছে CPIM? ককরোচদের (CJP) আন্দোলনে জেরবার BJP! কোন পথে ঐতিহাসিক জয় প্রশান্ত কিশোরের? নেপথ্যে ছাত্র আন্দোলন! BJP-র বিরুদ্ধে একজোট হচ্ছে মানুষ? বাঁকিপুর ভাবাচ্ছে নরেন্দ্র মোদীকে নেপথ্যে ছাত্র আন্দোলন! BJP-র বিরুদ্ধে একজোট হচ্ছে মানুষ? বাঁকিপুর ভাবাচ্ছে নরেন্দ্র মোদীকে

‘মাথায় তুলে নে রে ভাই’ বাংলার শাড়ির সঙ্গে লেপ্টে আছে ইতিহাস-স্বদেশ চেতনা

২০ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

বাংলা ‘শাড়ি’ শব্দটির উৎপত্তি মূলত সংস্কৃত ভাষা থেকে। সংস্কৃত ‘শাটি’ (বা ‘সাটী’) শব্দ থেকে এসেছে শাড়ি। যার অর্থ এক ফালি কাপড়। কিন্তু এই এক ফালি কাপড়কেই শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায় বাঙালি। বাংলার এই তাঁতের শাড়ির ইতিহাস ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো । ইবন বতুতার লেখায় বাংলার তাঁতের উল্লেখ মেলে। মোঘল আমল থেকেই এই তাঁত জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ইতিহাস বলছে সিন্ধু উপত্যকা থেকে তাঁতিরা প্রথম এসেছিলেন মুর্শিদাবাদে। এরপর সেখান থেকেই অবিভক্ত সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েন তাঁরা। কিন্তু ইংরেজদের পথের কাঁটা হয়ে উঠেছিল তাঁতিরা। বিদেশের পোশাক ভারতের বাজারে ঢোকাতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছিল ব্রিটিশরা। তাঁতিদের উপর অত্যাচার চালালেও তাঁরা দমে যাননি। নিজেদের শিল্প বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে লড়েছেন। দেশভাগের আগে কিছু তাঁতি চলে আসেন পশ্চিমবঙ্গে কিছু রয়ে যান বাংলাদেশেই। আজও সেই বাংলার শাড়িই সারা বিশ্বে বন্দিত।

বাংলার শাড়ির প্রধান এবং অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল আরাম। হদ্দ গরমেও খাঁটি সুতির শাড়ির বিকল্প আর কিছু হতে পারে না। প্রাকৃতিক তন্তু বুনে যে শাড়ি তৈরি হয় তা তুলোর মতো নরম এবং পালকের মতো হালকা হয়। তার উপরেই সুতোয় ফুটিয়ে তোলা হয় নানা নকশা। ভৌগলিক পরিচয় বা জিওগ্রাফিকাল আইডেন্টিফিকেশন (GI Tag) এর আওতায় এসেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী তিনটি শাড়ি। বাঁকুড়ার বালুচরী, হুগলির ধনেখালি এবং নদিয়ার শান্তিপুরের তাঁতের শাড়ি।

বাংলার শাড়ি

শাড়ির পাড়ে পুরাণ: বালুচরী

যদিও বর্তমানে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর বালুচরী শাড়ির প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র, কিন্তু এর সূচনা হয়েছিল মুর্শিদাবাদের ‘বালুচর’ নামের একটি গ্রামে। অষ্টাদশ শতকে বাংলার তৎকালীন নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে এই বয়নশিল্পের ধারাকে বাংলায় নিয়ে আসেন। তিনি মুর্শিদাবাদের ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত বালুচর গ্রামে তাঁতিদের জন্য একটি স্থায়ী বসতি ও তাঁতশিল্প কেন্দ্র গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন। তবে ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পর নবাবী পৃষ্ঠপোষকতা কমতে থাকে, ফলে বালুচরী শাড়ির উৎপাদনে বড় ধরনের বাধা আসে। তার ওপর, এক ভয়াবহ বন্যায় বালুচর গ্রাম প্লাবিত হলে তাঁতি সম্প্রদায় বাধ্য হয়ে বিষ্ণুপুরে স্থানান্তরিত হন। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই বিষ্ণুপুর থেকেই বালুচরী শাড়ি তার হারানো গৌরব ও জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার করতে শুরু করে।
বালুচরী শাড়ির মূল বিষয় হল এর আঁচল জুড়ে আঁকা থাকে রকমারি পৌরাণিক চরিত্র। শিল্প-সংস্কৃতির একনিষ্ঠ অনুরাগী মল্লরাজারা তাঁতিদের উৎসাহিত করতেন রামায়ণ-মহাভারত, কৃষ্ণলীলা এবং অন্যান্য হিন্দু পুরাণকাহিনি শাড়ির আঁচলে নকশায় ফুটিয়ে তুলতে। সেইসময়ে তৈরি টেরাকোটার মন্দির, দেবদেবীদের নকশাও পাওয়া যায় শাড়ির ভাঁজে। তবে বালুচরীর জন্য বিষ্ণুপুর GI – ট্যাগ পেলেও আজও তর্ক রয়েছে এই শাড়ির উৎপত্তিস্থল নিয়ে৷

পাড়ে পুরাণ- বালুচরী

৫০০ বছরের ঐতিহ্য: শান্তিপুরের তাঁত

গৌড়ের রাজা গণেশ দানু সাধনদেবের শাসনামলে (প্রায় ১৪০৯ খ্রিস্টাব্দে) শান্তিপুরে প্রথম শাড়ি বোনার সূচনা হয়। আনুমানিক ১৪৬০–১৫৫৮ সময়কালের বৈষ্ণব সাহিত্য ‘অদ্বৈতমঙ্গল’-এ (শ্রী অদ্বৈত আচার্যের জীবনী ও কার্যকলাপ প্রসঙ্গে) শান্তিপুরের এই সমৃদ্ধ হস্তশিল্প ও তাঁতিদের কথা বিশেষভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। কথিত আছে, পরবর্তীতে মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যদেবের বার্তা ও পরামর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ (বাংলাদেশ) থেকে একদল দক্ষ তাঁতি শান্তিপুরে এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। তাঁরা তাঁদের পারিবারিক বয়নশিল্প ও তাঁত বোনার বিদ্যা সঙ্গে নিয়ে আসেন, যার ফলে স্থানীয় হস্তশিল্পে এক অভূতপূর্ব গতি সঞ্চারিত হয়। নদীয়ার রাজা রুদ্র দেব রায়ের (১৬৮৩–১৬৯৪) আমলে শান্তিপুরের এই তাঁতশিল্প প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক রূপ লাভ করে।
ব্রিটিশদের শাসনকালে তাঁতিদের উপর অত্যাচার চালানো হতো যাতে তারা বাংলার সেরা মসলিন, বস্ত্র এবং তুলো ইউরোপে নিয়ে যাওয়া যায়। বদলে ব্রিটিশরা মেশিন নির্মিত রাসায়নিক কৃত্রিম বস্ত্র এদেশে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। একসময় তাঁতিরা নিঃস্ব হয়ে গিয়েও দমে যাননি। দাদনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁরা একজোট হয়েছিলেন। ইতিহাস, স্বদেশপ্রেম লেপ্টে থাকা এই শাড়িও জিআই ট্যাগ অর্জন করেছে। ফুলিয়া শান্তিপুরের তাঁত জগৎখ্যাত।

শান্তিপুরের শাড়ি

আদর আছে, বাজার নেই: ধনেখালি শাড়ি

হুগলির চিনসুরা মহকুমার ধনেখালি থেকে উৎপন্ন এবং তাঁতশিল্পের ‘সোনার ফসল’ হিসেবে পরিচিত ধনেখালি শাড়ি তার হালকা বুনন, টেকসই গঠন ও অনবদ্য আরামের জন্য ভারত সরকারের মর্যাদাপূর্ণ জিআই (GI) ট্যাগ লাভ করেছে। পূর্বে মূলত সাদা বা কোরা জমিনে লাল কিংবা কালো পাড়ে বোনা হলেও, বর্তমানে ধনেখালির পাশাপাশি হুগলির হরিপাল, রাজবলহাট, রশীদপুর ও অন্তপুরের তাঁতিরা এতে নানান রঙের সুতোর বৈচিত্র্যময় নকশা ফুটিয়ে তুলছেন।

‘সোনার ফসল’ ধনেখালি

অর্থাৎ আজও এই একফালি কাপড়ের উপরেই বাংলার তাঁতিরা নিরলস পরিশ্রমে ফুটিয়ে তুলছেন স্বদেশের সংস্কৃতি, হাতের কাজ। নিত্য নতুন যন্ত্রে বোনা রকমারি শাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়ছে বাংলার ঐতিহ্য, ইতিহাস। বাজারের অভাবে ধুঁকছে এই শিল্প। পুঁজিবাদের মধ্যস্ততায় দাম পাচ্ছেন না বাংলার তাঁতিরা। তাই এই শাড়ি মাথায় তুলে রাখার দায় এবং দায়িত্ব বাঙালিরই।

অন্যান্য প্রতিবেদন.