দিল্লির যন্তর-মন্তরে অনশনরত তিনি। তাঁকে ঘিরে নানা কথা রটছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কেউ তাঁকে বলছে ‘গদ্দার’, কেউ বা ‘চিনের দালাল’, কিন্তু আজ আমরা জানব কে এই সোনম ওয়াংচুক (Sonam Wangchuk)? কেন বলিউডের বাণিজ্যিকভাবে প্রবল সফল একটি ছবিতে সোনমের জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়?
আজ যখন ‘বার্নআউট’, মানসিক চাপ বা কর্মজীবনের প্রতিযোগিতা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা চলছে, তখনও ওয়াংচুকের দর্শন সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। লাদাখের ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক, বর্তমানে তিনি দিল্লির যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অনশন আন্দোলনে রয়েছেন। 3 Idiots-এর শেষ পর্বে দর্শক জানতে পারেন, র্যাঞ্চোর আসল পরিচয় ‘ফুনসুখ ওয়াংডু’— লাদাখের এক উদ্ভাবক ও শিক্ষক। সেই থেকেই র্যাঞ্চোকে অনেকেই মনে করেন ওয়াংচুকের প্রতিচ্ছবি। যদিও সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে ওয়াংচুকের সঙ্গে র্যাঞ্চোর সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভাবে অস্বীকার করেছেন আমির খান। কিন্তু ওই ছবিরই আরও এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র চতুরের দাবি ওয়াকচুকের জুতোতেই পা গলিয়েছিলেন আমির। এই বিতর্ককে একপাশে রেখেই জেনে নেওয়া যাক ওয়াংকচুকের জীবন দর্শন।
ওয়াংচুকের বিশ্বাস ছিল, শিক্ষা এমন হওয়া উচিত যা বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে শেখায়। শুধু বইয়ের পাতা মুখস্থ করাই শিক্ষার লক্ষ্য হতে পারে না। ওয়াংচুক এমন একটি স্কুলের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে ছাত্রছাত্রীরা শুধু বই পড়ে না, বরং নানা জিনিস তৈরি করে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এবং হাতে-কলমে শেখে। এই ভাবনাকেই তিনি বাস্তবায়িত করেন স্টুডেন্টস এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল মুভমেন্ট অব লাদাখ (SECMOL)- স্কুলের মাধ্যমে। এই স্কুলের শিক্ষাপদ্ধতি মুখস্থবিদ্যার বদলে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখার উপরই জোর দেয়।

এই ওয়াংচুকেরই আবিষ্কার, আইস স্টুপা (Ice Stupa) প্রযুক্তি। লাদাখের শীতলতম অঞ্চলে জল সংকট দূর করে এই প্রযুক্তি। শীতকালে অতিরিক্ত জল বরফের স্তূপে সংরক্ষণ করে গ্রীষ্মে ধীরে ধীরে গলিয়ে কৃষিকাজে ব্যবহার করার অভিনব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন এই সোনমই। জলসংকট মোকাবিলায় এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।

তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছেন Himalayan Institute of Alternatives, Ladakh (HIAL), যেখানে পাহাড়ি অঞ্চলের উপযোগী প্রযুক্তি, টেকসই উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনভিত্তিক উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। লাদাখের তীব্র ঠান্ডায় বিদ্যুৎ ছাড়াই উষ্ণ থাকার জন্য সৌরশক্তি-নির্ভর ভবন (Passive Solar Buildings) নির্মাণে কাজ করেছেন তিনি। লাদাখের পরিবেশ, হিমবাহ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন। সরব হয়েছেন শিক্ষা সংস্কার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং স্থানীয় মানুষের অধিকার নিয়ে।

রাজকুমার হিরানি ও আমির খান সোনম ওয়াংচুকের জীবন ও ভাবনাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে তৈরি করেছিলেন হিন্দি সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র ‘র্যাঞ্চো’। দর্শক প্রথমে তাঁকে দেখেছিল এক মজার ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র হিসেবে, পরে চিনেছিল ‘ফুনসুখ ওয়াংডু’ হিসেবে। আর সময়ের সঙ্গে সেই চরিত্রই হয়ে উঠেছে এক কাল্ট আইকন। দিল্লিতে ককরোচ-দের মঞ্চে তাঁর অনশন ২০ দিনে পড়ল, স্বাস্থ্যহানি জ্বলজ্বল করছে তবুও দাবি পূরণ না হওয়া অবধি পিছু হটতে নারাজ ওয়াংচুক। এখনও তাঁর কথা একবার না শোনা হলে, আগামী প্রজন্ম লড়াই করার শক্তি হারিয়ে ফেলবে। বিশ্বাস করতে শুরু করবে এই পোড়া দেশে প্রতিবাদ করে সত্যিই কিছু হয় না।

