হাসপাতালে মেলেনি জায়গা, ফুটপাতে প্রসব দলিত মহিলার

১১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​ভারতের উত্তরপ্রদেশের বারাণসী তথা সংলগ্ন জ্ঞানপুর এলাকায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক অমানবিক ও মর্মান্তিক ঘটনা দেশের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং সামাজিক কাঠামোর এক চরম অধঃপতনকে উন্মোচিত করেছে। মহারাজা ছেৎ সিং জেলা হাসপাতালে দলিত সম্প্রদায়ের এক প্রসূতি মহিলাকে কেবল তার জাতের কারণে ভর্তি না করার অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে হাসপাতালের বাইরে রাস্তার পাশেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হন ওই নারী।


​এই ঘটনা দেশের সরকারি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটি স্পষ্ট করে তোলে। সংবিধানে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের কথা বলা হলেও, বাস্তবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে থাকা প্রান্তিক ও অবহেলিত মানুষেরা কতটা অরক্ষিত, তা এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। প্রসবের মতো একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি যেখানে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িত, সেখানেও যদি জাতপাতের পরিচয় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার রক্ষার নীতিকেই ব্যর্থ প্রতিপন্ন করে।


​ঘটনাটি উত্তরপ্রদেশের মতো একটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বাস্তব অবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। ঘটনার জেরে উপমুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠকের হস্তক্ষেপে এবং ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ (যেমন সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের বরখাস্ত এবং তদন্ত কমিটি গঠন) নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা থেকে তৈরি হলেও, তা কাঠামোগত কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। ঘটনার দায় কেবল কয়েকজন চিকিৎসকের ওপর চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র বা সমাজ তার নিজ দায়িত্ব এড়াতে পারে না।


​বিশেষ করে মুশহর সম্প্রদায়, যারা দলিত সমাজের মধ্যেও অন্যতম পিছিয়ে পড়া ও প্রান্তিকগোষ্ঠী, তাদের প্রতি মূলধারার সমাজ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ই অবহেলাপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সংবিধানের দৃষ্টিতে সমতা অর্জিত হলেও, দৈনন্দিন সামাজিক মানসিকতা এবং ক্ষমতার সমীকরণে প্রান্তিক মানুষরা আজও নাগরিক হিসেবে পূর্ণ সম্মান ও অধিকার থেকে বঞ্চিত।
​পরিশেষে বলা যায়, এই ঘটনাটি কোনো সাধারণ চিকিৎসা সংক্রান্ত ত্রুটি নয়, এটি সরাসরি মানবাধিকার এবং সামাজিক সমতার লঙ্ঘন। যতক্ষণ না পর্যন্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে জাতভিত্তিক পক্ষপাত ও বর্ণবাদী মানসিকতা পুরোপুরি নির্মূল করা যায় এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর রাজনৈতিক স্লোগান নিছক ফাঁকা বুলি হিসেবেই প্রতিভাত হবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.