“ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে-জন মারে আর শুধু মরে”-
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের গৃহকোণে আয়োজিত প্রার্থনা সভাগুলো আকস্মিকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন। উলুবেড়িয়া থেকে শুরু করে পূর্ব বর্ধমান বা পূর্ব মেদিনীপুর—প্রার্থনা কক্ষ থেকে শুরু করে এমনকি অন্তিম যাত্রার সমাহিত দেহ পর্যন্ত উন্মত্ত জনরোষের শিকার হওয়ার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিকাঠামোয় এক গভীর ফাটলের ইঙ্গিত দেয়।
রাজনীতি সবসময় ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে কারবার করে, কিন্তু যখন সেই সমীকরণের পারদ সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও প্রার্থনার ঘরে গিয়ে আঘাত হানে, তখন গণতন্ত্রের ভিত কেঁপে ওঠে। হাওড়ার উলুবেড়িয়ায় রবিবারের প্রার্থনা চলাকালীন একদল উন্মত্ত মানুষের হামলা, কিংবা পূর্ব বর্ধমানের সাহানগরে অন্তিম সংস্কারের সময় কফিন কবর থেকে টেনে বের করে নেওয়ার মতো বর্বরোচিত দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধত্ব আজ যুক্তির টুঁটি চেপে ধরতে চাইছে। খ্রিস্টান গোষ্ঠীগুলির সর্বভারতীয় ও আঞ্চলিক সংগঠনগুলির তথ্য অনুযায়ী, একের পর এক এমন ঘটনা ঘটলেও আতঙ্ক ও ভয়ের বশে বহু মানুষ থানায় অভিযোগ পর্যন্ত জানাতে সাহস পাচ্ছেন না।
মেরুকরণের যে সুদূর প্রসারী ছায়া জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে বিস্তার লাভ করেছে, তা এখন বাংলার উর্বর মাটিতেও তার দীর্ঘতম শাখা প্রশাখা ছড়াতে শুরু করেছে। একদিকে উগ্র ডানপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলি সরাসরি ময়দানে নেমে অভিযোগ তুলছে যে, অর্থের লোভ দেখিয়ে বা নানা কৌশলে ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ’ (Forced Conversions) চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে, এই অভিযোগের পাল্টায় রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যখন সংঘাতের মেঘ ঘনায়, তখন রাষ্ট্র বা প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার কথা। কিন্তু সমালোচকদের মতে, বাংলার বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই নির্বিকার বা রহস্যজনক। কোথাও অভিযোগ দায়ের করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা, আবার কোথাও খোদ ভুক্তভোগীদের পরিচয় ও তহবিলের উৎস নিয়ে জেরা করার অভিযোগ উঠছে।
রাজ্য সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা বলছেন যে, “ব্যক্তিগত প্রার্থনা মানুষের মৌলিক অধিকার, এবং সরকার কারও বিশ্বাসের অধিকারে হস্তক্ষেপ করে না; তবে জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ বরদাস্ত করা হবে না”, তবুও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে এই ধরনের দ্বিমুখী অবস্থান প্রকারান্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদেরই পরোক্ষভাবে সাহস জোগায়। একদিকে অপরাধ দমনে কঠোর আইনি পদক্ষেপের অভাব এবং অন্যদিকে ‘ধর্মান্তকরণের তত্ত্বকে’ সামনে রেখে প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে বাংলার রাজনীতি এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। বিরোধী দলগুলোর দাবি, ভিন রাজ্যে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে মডেল দেখা গেছে, আজ তা সুপরিকল্পিতভাবে বাংলায় আমদানি করা হচ্ছে।
একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে মানুষ কোথায় প্রার্থনা করবে, কীভাবে তার ধর্ম পালন করবে—তা সংবিধানের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আজকের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় বিশ্বাসের জায়গাকেও সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। বাড়ি বা গৃহকোণের ছোট ছোট প্রার্থনা সভাগুলো যদি আজ ‘ষড়যন্ত্রের আখড়া’ হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করে, তবে তা বহুত্ববাদী সংস্কৃতির অবক্ষয়ের স্পষ্ট বার্তা দেয়। রবীন্দ্রনাথের বাংলায় আজ বিশ্বাসের চেয়ে অনাস্থার দেওয়াল উঁচুতে উঠছে।
বাংলার এই সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ কেবল আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক চেতনার এক ঘোর অমানিশা। ধর্ম এখানে বিশ্বাসের আলো ছড়ানোর বদলে রাজনীতির জ্বালানি কাঠ হয়ে উঠেছে। যদি সময়মতো প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলি সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে এই মব কালচার বা জনরোষের রাজনীতিকে কঠোর হাতে দমন না করে, তবে আগামী দিনে বাংলার শান্ত ও সহনশীল সমাজব্যবস্থা এমন এক অন্ধকূপে হারিয়ে যাবে, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ হয়তো আর মিলবে না৷

