যাঁরা সমাজের তলায় পচে মরে, যাঁদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয় বাংলার আকাশ—তাঁরাই এই মাটির মূল প্রাণপ্রবাহ। অথচ ইতিহাস তাদের কপালে এঁকে দিয়েছে চিরবঞ্চনার সিলমোহর। নমশূদ্র৷
সংবিধানের খাতায় তকমাটি ‘তফসিলি জাতি’ বা এসসি হলেও, সমাজের মনস্তত্ত্বে আজও গভীর ভাবে শেকড় গেড়ে রয়েছে সেই পুরনো সামন্ততান্ত্রিক বৈষম্য। শতবর্ষ আগে শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর যে মহান সমাজ সংস্কারের ডাক দিয়েছিলেন—যেখানে জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা ও ভেদাভেদের কোনো স্থান ছিল না—আজ একবিংশ শতকের আধুনিক রাষ্ট্রে দাঁড়িয়েও সেই আদর্শ যেন ধুলিস্মৃত।
বাংলার আবহমান সংস্কৃতিতে উৎসব মানেই এক সার্বজনীন মিলনমেলা। কিন্তু,শত শত বছর ধরে যে মেহনতি মানুষগুলো চামড়ার টানে কাঠ-বাঁশের ফ্রেমে ঢাক তৈরি করে উৎসবের প্রাঙ্গণে বোল তোলে, সেই মতুয়া কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষগুলোর স্থান কি কেবল বাদ্যযন্ত্রের খোলেই বন্দি থাকবে?
মতুয়া সমাজ তথা দলিত ও পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় যুগ যুগ ধরে কায়িক শ্রমে নিজেদের উৎসর্গ করে এসেছে। তারা কাঠ খোদাই করে ঢাক বানায়, চামড়ায় বোল তোলে, আর পুজোর কদিন সেই ঢাকের তালে মেতে ওঠে গোটা সমাজ। শ্রমের বেলায় সর্বজনীনতার ধুয়ো তোলা হলেও, ক্ষমতার অংশীদারিত্বের বেলায় অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দেওয়া হয়। মতুয়াদের লোকসংস্কৃতি এবং বাদ্যশিল্পকে উৎসবের রসদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী জায়গায় তাদের প্রবেশাধিকার আজও নিয়ন্ত্রিত।তখন তথাকথিত উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নিজেদের একক অধিকারের দাবিদার হিসেবে সামনে চলে আসে।

প্রাচীন মনুবাদী সামাজিক বিন্যাস যেখানে মানুষকে জন্মসূত্রে উচ্চ ও নীচ ভাগে ভাগ করেছিল, তার আধুনিক রাজনৈতিক সংস্করণ আজও বাংলার জনমানসে সক্রিয়। রাজনৈতিক দলগুলি ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে মতুয়া বা নমশূদ্র ভোটকে নিজেদের বাক্সে টানতে মরিয়া থাকে; কিন্তু ধর্মীয় কাঠামোর ভেতরে থাকা জাতপাতের দেওয়াল ভাঙার কোনো প্রকৃত সংস্কারমুখী রাজনৈতিক সদিচ্ছা তারা দেখায় না। ধর্মীয় আধিপত্যবাদ ও উচ্চবর্ণের সামাজিক নাকউঁচু স্বভাব এমন এক অদৃশ্য গণ্ডি কেটে দিয়েছে, যেখানে মতুয়া বা অনগ্রসররা কেবল উৎসবের ‘শ্রমিক’ বা ‘দর্শক’, কিন্তু ‘কর্তা’ বা পুরোহিত নয়৷
মতুয়া সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক গুরুত্ব আজ সর্বজনবিদিত। রাজনৈতিক দলগুলির কাছে তাঁরা যেন তুরুপের তাস—এক অবিনাশী ভোটের ব্যাংক। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রাপ্তি ঠিক কতখানি?নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার সময় রাজনৈতিক দলগুলির কাছে তারা অপরিহার্য ‘ঢাক বাজানোর লোক’। ভোটের বাক্সে তাদের ভোট নিশ্চিত করতে বড় বড় প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছোটানো হয়, ধর্মীয় আবেগকে উসকে দেওয়া হয়, এবং ক্ষমতার অলিন্দে তাদের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের আখের গোছানো হয়।
ওপার বাংলা থেকে ছিন্নমূল হয়ে এপারে এসে পৌঁছানো এই মানুষগুলোর বহু প্রজন্মের একটাই আকুল আবেদন ছিল—একটি আইনি স্বীকৃতি, একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকত্ব। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) বাস্তবায়নের বিষয়টি মতুয়া ভোটারদের মন জয় করার বা নিজেদের দিকে টানার এক প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। শাসক ও বিরোধী—উভয় পক্ষই এই সংবেদনশীল ইস্যুকে কেন্দ্র করে মতুয়াদের মনস্তত্ত্বকে নিজেদের অনুকূলে চালনা করার নিরন্তর খেলায় মেতেছে। প্রতিবার নির্বাচনের পদধ্বনি শোনা মাত্রই নাগরিকত্বের দীর্ঘমেয়াদী কার্ড খেলা হয়। কিন্তু এই আইনি মারপ্যাঁচ ও রাজনৈতিক কূটচালের বেড়াজালে মতুয়াদের আবেগ বারবার পণবন্দী হয়ে পড়ে। নাগরিকত্বের রঙিন বেলুন উড়িয়ে তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য কিনে নেওয়ার এই প্রবণতা আসলে এক পরিশীলিত মানসিক শোষণ ছাড়া আর কিছুই নয়।
রাজনীতির কারবারিরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে যতই মতুয়াদের উন্নয়নের কথা বলুন না কেন, তৃণমূল স্তরে আজও তাদের ওপর নেমে আসে নানা অবহেলা। সরকারি প্রকল্পের ফোঁটা ফোঁটা সাহায্য কিংবা রাজনৈতিক পদবীতে ভাগ বসানোর সময় গুটি কয়েক সুবিধাভোগী দালাল নেতা লাভবান হলেও, মতুয়া সমাজের মূল স্রোতের মানুষগুলো সেই রয়ে যায় নমশূদ্র ও প্রান্তিক অচ্ছুৎ হিসেবেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্থায়ী কর্মসংস্থানের বেহাল দশা তাদের জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারে না অস্তিত্বের লড়াইয়ের অভিশপ্ত গ্লানি।
রাজনৈতিক দলগুলির করুণা বা দয়া ভিক্ষা করে নয়, বরং আত্মমর্যাদা এবং স্বাধিকার প্রতিষ্ঠাই এখন মতুয়া সম্প্রদায়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যতক্ষণ না মতুয়ারা কেবল ভোটের ‘সংখ্যা’ বা তূর্যবাদক হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া চিরতরে বন্ধ করে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে, ততক্ষণ এই বঞ্চনার চাকা অবিরাম ঘুরতেই থাকবে। ক্ষমতার বারান্দায় তারা কেবল দূর থেকে প্রতিমা দর্শনের অধিকারই পেয়ে যাবে, অন্দরে প্রবেশের চাবিকাঠি চিরকালই থেকে যাবে অধরা।

