আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচনের দিন ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন, ফল প্রকাশ হবে ৯ অক্টোবর, অর্থাৎ দুর্গাপুজোর ঠিক আগেই। মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা ৯ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর। দুটি আসনই আলাদা প্রকৃতির লড়াই তুলে ধরছে – একদিকে বিজেপির শক্তি-পরীক্ষা, অন্যদিকে রাজ্যের সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত রাজনৈতিক পরিসরে কর্তৃত্বের লড়াই।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর, দুটি আসনেই জয়ী হয়েছিলেন। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী একজন একাধিক আসন ধরে রাখতে পারেন না, তাই তিনি ভবানীপুর রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দেন। এরপর থেকেই এই আসনটি ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে। লক্ষণীয়, নন্দীগ্রামের সর্বদল বৈঠকে তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো প্রতিনিধিই উপস্থিত ছিলেন না, যা দলের মধ্যে সাংগঠনিক দ্বিধা বা কৌশলগত দূরত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
রেজিনগর আসনটি খালি হয়েছে অন্য কারণে। তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (AJUP) গঠনকারী হুমায়ুন কবীর এবার রেজিনগর ও নওদা দুটি আসনেই জয়ী হন। নিয়ম মেনে তিনি রেজিনগর আসনটি ছেড়ে দেন এবং সেখানে নিজের ছেলেকে প্রার্থী করার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু ভোটের দিন ঘোষণা হতেই সুর বদলে তিনি বাম-কংগ্রেস-তৃণমূল জোট গঠনের ডাক দিয়েছেন, যা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, নিজের শক্ত ঘাঁটিতেও তিনি একা লড়াইয়ে ভরসা পাচ্ছেন না।
রেজিনগর কেন্দ্রে প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোটার মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত, যা একে রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যালঘু-প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছে। মুর্শিদাবাদের এই অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের প্রভাব ছিল যথেষ্ট, পরে তৃণমূল সেই জায়গা দখল করে, আর সাম্প্রতিক নির্বাচনে হুমায়ুন কবীরের AJUP নিজস্ব একটা পরিসর তৈরি করে নেয়। ফলে এই একটি আসনকে কেন্দ্র করেই এখন প্রশ্ন উঠছে – তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিএম, আইএসএফ ও AJUP।এই পাঁচ শক্তির মধ্যে বাংলার সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে।
তাছাড়াও তৃণমূলের সাংগঠনিক বিচ্ছেদের পরে, তাদের জোড়াফুল চিহ্নের আসল হকদার কে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিদ্রোহী তৃণমূলের ফিরহাদ হাকিম বলে দিয়েছেন, যে তাঁরা দুই কেন্দ্রেই প্রার্থী দেবেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কতৃত তৃণমূলের পক্ষ থেকে এখনও কোনো মন্তব্য আসেনি। তবে জানা যাচ্ছে, দুইজন পুরোনো চেনা মুখকে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব উপাখ্যান করেছেন। বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় দাবি করছেন, যে বিজেপি এই নির্বাচনকে নানা অছিলায় প্রভাবিত করতে পারে।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে রাজ্যের সংখ্যালঘু সমাজের মধ্যে যে রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, রেজিনগরের ফলাফল তারই একটা বাস্তব পরীক্ষাক্ষেত্র। তৃণমূলের ভাঙন ও নেতৃত্ব-সংকট সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যেও একধরনের দ্বিধা তৈরি করেছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন। পুরনো ভরসার জায়গা দুর্বল হওয়ায় ভোটাররা এখন বিকল্প খুঁজছেন, আর ঠিক এই শূন্যস্থান পূরণের লড়াইয়েই নেমে পড়েছে একাধিক দল।
এই দুই উপনির্বাচন আসলে দুটি ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে। নন্দীগ্রামে লড়াই, মূলত বিজেপির নিজস্ব ঘাঁটি কতটা মজবুত, আর ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বড় নির্বাচনী পরীক্ষায় তারা কতটা সফল হয় সেই প্রশ্নের। রেজিনগরে বিজেপির জেতার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম, আসল লড়াই বিরোধী শিবিরের মধ্যেই, কে সংখ্যালঘু ভোটের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তাই এই আসনের ফলাফল শুধু একটি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিনিধি নির্বাচনই নয়, বরং আগামী দিনে বাংলার বিরোধী রাজনীতির অভিমুখ কোন দিকে যাবে, তারও একটা আগাম ইঙ্গিত দেবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

