শারদোৎসব বনাম দুর্গাপুজো, রাজনীতি সাহিত্য এবং বাঙালির মনন

৭৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৮ সালে, তাঁর রচিত একটি রূপক-সাংকেতিক নাটকের নাম হিসেবে শারদোৎসব শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন৷ পরবর্তীকালে, বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা এবং তার সমকালীন আনন্দ-আয়োজনকে সামগ্রিকভাবে বোঝাতে এই ‘শারদোৎসব’ শব্দটি বাঙালি সমাজের অঙ্গে অঙ্গে জড়িয়ে যায়৷ মাতৃপক্ষের সূচনা হয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে হৃদয়পূর্ণ করা উচ্চারণে- ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর;ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা;’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত নাটক- শারদোৎসব


এই “শারদোৎসব” শব্দবন্ধকে কেন্দ্র করে পরিবর্তনের ​বাংলায় আজ হঠাৎ করে তৈরি হয়েছে বিতর্ক৷ পুজো কমিটিগুলির মণ্ডপে বা তার চত্বরে বামেদের ঐতিহ্যবাহী ‘মার্ক্সীয় সাহিত্য ও প্রগতিশীল বই বিক্রয় কেন্দ্র’-এর নামকরণ এবং ভাষা নিয়ে শুরু হয়েছে তরজা। একদিকে রাজনৈতিক আক্রমণ ও পাল্টা চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে এই বিতর্ক এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে।


​বিধানসভায় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সংশোধনী বিল নিয়ে আলোচনার সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বামেদের তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বামপন্থীরা সনাতন ধর্মকে রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলেও দুর্গাপুজোর নাম এড়িয়ে ‘শারদ-উৎসব’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি পুজো কমিটিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, বইয়ের স্টলে যদি নির্দিষ্ট করে ‘দুর্গাপুজো’ না লেখা হয়, তবে সেখানে স্টল করতে দেওয়া হবে না। এর জবাবে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম ও নেতা সুজন চক্রবর্তী তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁরা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “শারদোৎসবে বইয়ের স্টল হবেই, কেউ ঠেকাতে পারবে না।” একই সঙ্গে, অতীতে শুভেন্দুর নিজের সমাজমাধ্যমে ‘শারদ উৎসব’ লেখার বিষয়টিও তুলে ধরেছে বাম শিবির।

২০২৫ সালে দুর্গাপুজোয় শুভেন্দু অধিকারীর শুভেচ্ছাবার্তা


​ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শারদোৎসব’ নাটকটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সাহিত্যিক ও অধ্যাপকদের একাংশ জানাচ্ছেন যে, এই শব্দবন্ধটি আদতে বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাহিত্য অকাদেমির প্রাক্তন রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী শারদোৎসব শব্দে বাঙালির সমন্বয়ী সংস্কৃতির ধারা বহমান। রবীন্দ্রনাথ ধর্মের আচার সর্বস্বতার বাইরে বৃহত্তর ব্যঞ্জনা অনুভব করতেন।
​
​বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘শারদা’ শব্দটির অন্যতম অর্থ যে দুর্গা, তা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষেও’ স্পষ্টভাবে রয়েছে। পুজো ও উৎসবের এই কৃত্রিম বিভাজন বাঙালির হাজার বছরের মিশ্র সংস্কৃতির পরিপন্থী। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে প্রাক্-উপনিবেশ যুগের সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন বা কমলাকান্ত ভট্টাচার্য—সকলেই দুর্গাপুজোর মধ্যে মা ও কন্যার মহামিলন এবং দেশমাতৃকার রূপ খুঁজে পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখায় এই উৎসবকে বাঙালির গৃহের চিরন্তন আগমনী বিজয়ার আসনে বসিয়েছেন।
​
রাজনীতিতে বিতর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু ভাষার মারপ্যাঁচে যখন শিল্প-সাহিত্য ও রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে টেনে আনা হয়, তখন তা কেবল রাজনৈতিক দলগুলির বাকযুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের পরিসরে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দেয়।

অন্যান্য প্রতিবেদন.