আবেগকে অস্ত্র করে নন্দীগ্রামে লড়াইয়ে শুভেন্দু, প্রার্থী হাসিরানি রথ

৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন


আসন্ন নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী করেছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রয়াত আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথকে। মঙ্গলবার শাসকদল প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরই হাসিরানি মনোনয়ন জমা দেন, আর মনোনয়নের সময় তাঁর সঙ্গে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন শুভেন্দু নিজেই। এদিন এক কিলোমিটার পদযাত্রা করে হলদিয়ার মহকুমাশাসকের দফতরে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী, তার আগে রেয়াপাড়ায় সিদ্ধেশ্বর শিবমন্দির ও জানকীনাথ মন্দিরে পুজো দেন হাসিরানি।

উল্লেখযোগ্য বিষয়, হাসিরানি রথ রাজনীতির ময়দানে একেবারে নতুন মুখ নন। ১৯৯৮ সাল থেকে প্রায় ২৮ বছর ধরে তিনি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। প্রার্থী হয়ে তিনি বলেন, নন্দীগ্রামের দু’বারের বিধায়ক তথা রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এলাকাবাসীর প্রায় সব চাহিদাই ইতিমধ্যে পূরণ করেছেন, আর তিনি নিজে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করবেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিজেপির লক্ষ্য এই আসনে প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়, যদিও চূড়ান্ত সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া বাকি।

গত বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছিলেন শুভেন্দু। পরে ভবানীপুর রেখে নন্দীগ্রাম আসনটি ছেড়ে দেন, ফলে আগামী ৬ অক্টোবর সেখানে উপনির্বাচন হতে চলেছে। এর আগেই এই আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে কালীঘাটপন্থী তৃণমূল, ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল, কংগ্রেস ও সিপিএম। একই দিনে রেজিনগর কেন্দ্রেও প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিজেপি। মুর্শিদাবাদের প্রাক্তন জেলা সভাপতি শাখারভ সরকারকে সেখানে টিকিট দেওয়া হয়েছে।

প্রার্থী ঘোষণার সভায় শুভেন্দু সরাসরি সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন, তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে থাকতে চান কি না, আর নন্দীগ্রাম-রেজিনগরের ফলাফলকে তিনি সংখ্যালঘুদের জন্য একরকম ‘পরীক্ষা’ বলে আখ্যা দেন। পাশ করবেন না ফেল করবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁদেরই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি বিরোধী প্রার্থীদের প্রতি কটাক্ষ করে তিনি দাবি করেন, ১৬ শতাংশ ভোট না পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে, আর কেউই সেই জামানত বাঁচাতে পারবে না।

সভা থেকে শুভেন্দু ফের একবার চন্দ্রনাথের হত্যার নেপথ্যে ‘ভাইপো গ্যাং’-এর যোগের অভিযোগ তোলেন। বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের ঠিক দু’দিনের মাথায়, গত ৬ মে রাতে মধ্যমগ্রামে গুলি করে খুন করা হয়েছিল চন্দ্রনাথকে। গাড়িতে চালকের পাশের আসনে বসে থাকা অবস্থায় বাইকআরোহী দুষ্কৃতীরা গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়, চালকও জখম হন। শুভেন্দুর দাবি, খুনের জন্য প্রায় দু’কোটি টাকা খরচ হয়েছিল এবং সেই অর্থ জোগানোর কাজ করেছে ‘ভাইপো গ্যাং’, শুটারদের টাকা পৌঁছে দেওয়া ব্যক্তিরা ডায়মন্ড হারবারের বাসিন্দা বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে প্রকৃত তদন্তের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সিবিআইয়ের চার্জশিটে নাম থাকা সাত জনের মধ্যে সরাসরি তৃণমূল-যোগ মেলেনি, এবং গ্রেফতার হওয়াদের মধ্যে দু’জন ছাড়া বাকিরা ভিন্‌রাজ্যের পেশাদার দুষ্কৃতী বলে জানা গেছে। ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে গ্রেফতার হওয়া সাগর ও সাহেব সোনকর – এই দু’জনও ডায়মন্ড হারবারের বাসিন্দা নন, তবে চন্দ্রনাথের পূর্বপরিচিত ছিলেন বলে সিবিআই সূত্রে জানা গেছে। অর্থাৎ শুভেন্দুর রাজনৈতিক অভিযোগ ও তদন্তকারী সংস্থার সরকারি তথ্যের মধ্যে কিছুটা ফারাক থেকেই যাচ্ছে।

হাসিরানি রথকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তটি নিছক একটি প্রার্থী-নির্বাচন নয়, এটি স্পষ্টতই একটি আবেগ-নির্ভর রাজনৈতিক বার্তা। নিজের ঘনিষ্ঠ সহকারীর মায়ের হাত ধরে শুভেন্দু আসলে চন্দ্রনাথের হত্যাকাণ্ডকে ভোটের মূল আখ্যানে পরিণত করতে চাইছেন, যেখানে সহানুভূতি ও প্রতিশোধের স্পৃহা একসাথে কাজ করবে ভোটারদের মনে। কিন্তু এই একই সভায় সংখ্যালঘুদের সরাসরি ‘পরীক্ষা’র ভাষায় সম্বোধন করাটা একটা প্রশ্ন তুলে দেয়। এটা কি প্রকৃত উন্নয়নের আহ্বান, নাকি এক ধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল, যেখানে ভোট না দিলে “শাস্তি”-র ইঙ্গিত স্পষ্ট? আর ‘ভাইপো গ্যাং’ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি ও সিবিআইয়ের সরকারি চার্জশিটের তথ্যের মধ্যে যে ফারাক দেখা যাচ্ছে, তা থেকে এটাও স্পষ্ট হয় যে, রাজনৈতিক বয়ান আর তদন্তের বাস্তবতা সবসময় এক পথে চলে না। শেষ পর্যন্ত নন্দীগ্রামের ভোটাররা আবেগ, প্রতিশ্রুতি ও অভিযোগের এই জটিল মিশ্রণকে কীভাবে বিচার করেন, তার ওপরই নির্ভর করবে এই উপনির্বাচনের প্রকৃত রাজনৈতিক তাৎপর্য্য।

অন্যান্য প্রতিবেদন.