ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাস বিশাল, বৈচিত্র্যময় এবং একই সাথে বহুস্তরীয় দ্বন্দ্ব ও জটিলতায় পূর্ণ। এই ইতিহাসের মধ্যে এমন কিছু অধ্যায় রয়েছে যা যুগপৎ মুগ্ধ করে এবং অন্তরাত্মাকে নাড়া দেয়। এর মধ্যে একটি অন্যতম জটিল এবং বিতর্কিত অধ্যায় হলো দেবদাসী প্রথা।
প্রাথমিক মধ্যযুগ থেকেই ভারতীয় মন্দিরগুলির শিলালিপি ও ঐতিহাসিক নথিপত্রে নারীদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। দশম ও একাদশ শতাব্দীর মধ্যে, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে, দেবদাসীদের বা মন্দির-নৃত্যশিল্পীদের এই সম্প্রদায়টি মন্দির সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।এই নারীরা কেবল শিল্পচর্চাই করতেন না, তাঁরা ছিলেন প্রাচীন সংস্কৃতির জীবন্ত বাহক। তাঁদের দৈনন্দিন ও বার্ষিক দায়িত্বের মধ্যে ছিল- দেবতার উদ্দেশে ভক্তিগীতি ও শাস্ত্রীয় নৃত্য পরিবেশন করা।প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংগীত, কবিতা, নৃত্যভঙ্গি এবং সাহিত্যধারা বহন করে নিয়ে যাওয়া।

প্রাথমিক পর্যায়ে এই নারীদের অনেকে সমাজে সম্মানিয়া ছিলেন৷ তাঁদের কেউ কেউ জমি ও মন্দিরের আয়ের অংশও পেতেন। কালের বিবর্তনে ধর্মীয় ভক্তির এই কাঠামোতে নানা বৈষম্য ও কুপ্রথা ঢুকে পড়ে। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের কিছু অঞ্চলে এই প্রথা সম্পূর্ণভাবে বংশানুক্রমিক হয়ে ওঠে এবং তা সরাসরি জাতপাত ও চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে গেঁথে যায়।
প্রভাবশালী জমিদার, সামন্ততান্ত্রিক প্রভু ,মন্দিরের পুরোহিতদের একাংশ এই প্রথাকে নারীদের শোষণের হাতিয়ার করে তোলে৷ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল এই নারীদের নিজেদের জীবন বা সম্মানের ওপর প্রায় কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিল না। দেবদাসী প্রথার সামাজিক সুরক্ষা ভেঙে পড়ে এবং ক্ষমতার অধিকারী পুরুষদের কাছে তা সহজেই যৌন শোষণের লাইসেন্সে পরিণত হয়।
উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং তৎকালীন সমাজসংস্কারকদের আন্দোলন এই পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ব্রিটিশ প্রশাসন ও ভিক্টোরিয়ান প্রভাবিত সমাজ ভারতীয় সংস্কৃতির বহুমুখী রূপকে সঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়। ঔপনিবেশিক সমাজ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্যবাহী নারী শিল্পীদের একটিমাত্র অবমাননাকর শব্দবন্ধের আওতায় নিয়ে আসে—”নাচ গার্ল” বা নটীরূপী নারী।ধীরে ধীরে এই শিল্পীদের ঠেলে দেওয়া হয় পতিতাবৃত্তির বৃত্তে। অবশেষে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে দেবদাসী প্রথা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়৷
প্রথার বিলুপ্তি ঘটলেও শিল্পের বিলুপ্তি ঘটে না। এখানেই জন্ম হয় এক প্যারাডক্সের —নারীকে সমাজ থেকে ছুঁড়ে ফেলা হলো, কিন্তু তাঁর বহন করা শিল্পটিকে গ্রহণ করা হলো সাদরে ।প্রাচীন ‘সাদির’ নৃত্য ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হলো আজকের সুপরিচিত ধ্রুপদী নৃত্য রূপ ভরতনাট্যম-এ।
এই নৃত্য মন্দির ও প্রান্তিক সমাজ থেকে বেরিয়ে প্রবেশ করল আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক মঞ্চে, সুধী সমাজের অডিটোরিয়ামে এবং সমাজের তথাকথিত উচ্চবিত্ত ও ‘ভদ্র’ পরিবারগুলোতে।
দেবদাসীদের ইতিহাস কেবল ভক্তির আবেগ বা নিছক শোষণের একটি একক খতিয়ান নয়। এটি এমন এক জটিল ভূখণ্ড, যেখানে একসাথে জড়িয়ে থেকেছে শিল্প, জাতপাত, লিঙ্গ পরিচয়, ধর্ম এবং ক্ষমতা। কিন্তু, এই রূপান্তরের মূল্য দিলেন যে নারীরা, যাঁদের বংশপরম্পরায় এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছিলেন, তাঁরাই সামাজিক স্তরে ব্রাত্য হয়ে রইলেন আজীবন৷ অথচ তাঁদের রক্ত-ঘামে পুষ্ট শিল্পটি পেল সর্বজনীন ‘ধ্রুপদী’ বা ক্ল্যাসিক্যাল মর্যাদা।

