সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক ছিলেন তারানাথ তর্কবাচস্পতি। না, বাঙালির মনে বিঁধে থাকার মতো বিষয়ের তো অভাব নেই, গুটিকয়েক হয়তো এই পণ্ডিতকে চিনবেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজে বলেছিলেন, “তারানাথ আমার চেয়ে অনেক বড় পণ্ডিত।” তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা ‘বাচস্পত্যবিধান’। রচনা করেছেন, শব্দস্তোমমহানিধি, দশকুমার চরিত, ছন্দমঞ্জরী, গায়ত্রী ব্যাখ্যা। সংস্কৃত ব্যাকরণ এবং অভিধান সাহিত্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ শব্দস্তোমমহানিধি। এই গ্রন্থে সংস্কৃত ভাষার এক বিশাল শব্দভাণ্ডার রয়েছে। বিদ্যালয় স্তরে সংস্কৃত শেখানোর সময় এই গ্রন্থ অপরিহার্য।
তারানাথ তর্কবাচস্পতি দেশ-বিদেশের অগণিত শিক্ষার্থীকে সংস্কৃত শিক্ষা দিয়েছেন। নিজগৃহে ‘ফ্রি সংস্কৃত কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। লোকে বলতেন পাণিনির অবতার। তাদের আদি নিবাস বরিশাল, এরপর পূর্ব বর্ধমানের কালনায় এসে বাস শুরু করেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অনুরোধেই কাপড় ও কাঠের ব্যবসা ছেড়ে তর্কবাচস্পতি মহাশয় সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণ অধ্যাপনা শুরু করেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁর নাম সুপারিশ করেছিলেন। গণিতশাস্ত্রেও তিনি ছিলেন পণ্ডিত।
ধাতুরূপ, শব্দরূপ বা বিভক্তির ছকগুলো দেখলে আজও সত্যি বলতে অনেকেরই কাঠখোট্টাই লাগে। তবে পুরোনো ঐতিহ্যর এক টান আছে, কলেজস্ট্রিটের রমানাথ মজুমদার স্ট্রিটে তর্কবাচস্পতি মহাশয়ের ঐতিহাসিক বাড়িটি আজ বিলুপ্ত। তিনি এই বাড়িতেই চালু করেন ‘ফ্রি সংস্কৃত কলেজ’। বহুদূর থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে থেকে সংস্কৃত পড়তেন। বাড়ির খানিকটা অংশ ও ফটকটি এখন দেখা যায়।
পটুয়াটোলা লেন ও রমানাথ মজুমদার স্ট্রিটের সংযোগস্থলের কাছে সত্যজিৎ রায় তাঁর বিখ্যাত অপু ট্রিলজির ‘অপরাজিত’ চলচ্চিত্রে এই ঐতিহাসিক স্থানটিকেই তুলে ধরেছিলেন। কিশোর অপু হাতে একটি বাক্স নিয়ে প্রথম ছাপাখানায় কাজ করতে ঢোকে, সেই দৃশ্যটি এই গলিতেই শুট করা হয়েছিল। তর্কবাচস্পতি মহাশয়ের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে আজ উঠেছে বিশাল এক ফ্ল্যাট। ঐতিহ্য হিসেবে টিকে আছে শুধু জীর্ণ ফটক ও তাতে অস্পষ্ট ফলকে লেখা ‘REVIVER OF SANSKRIT LORE’।
তারানাথ তর্কবাচস্পতি ব্যবসাও ভালো বুঝতেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অনুরোধে ব্যবসা ছেড়ে দেন। তর্কবাচস্পতি মহাশয়ের পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে সাহেবরা তাঁকে সংস্কৃত সাহিত্যের জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া আখ্যা দেন। ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি তর্কবাচস্পতি উপাধি পান। হিন্দুসমাজের নানা কুসংস্কার নিয়েও সরব ছিলেন সর্বদা। আরেকদিকে, স্ত্রীশিক্ষার বিষয়ে সরব হন। বেথুন সাহেবের মেয়েদের স্কুলে নিজের কন্যা জ্ঞানদাদেবীকে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। আধুনিকতার আড়ালে আজ এক মহীরূহ। ইতিহাসের এক ক্ষত হয়ে টিকে আছে তাঁর ভিটেটি।

