নকশী কাঁথা: বাঙালি নারীর নীরব প্রতিরোধ ও জীবনের আলেখ্য কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের নাগরিকত্ব যাচাই ও হয়রানির সংকট, ভাষার বুলডোজার! বাংলা থেকে আমেরিকান ক্যাপিটালিজম: সিয়ারসাকারের দাসত্ব ও আভিজাত্যের ইতিহাস অবৈধ মাইনিং এবং পরিবেশ উদাসীনতায় ডুবছে আসাম বালাঘাটে শিশুমৃত্যু,স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা ও বৈগা আদিবাসী সংকট এক বছরের মধ্যে, RSS পরিচালিত ১০০০টি স্কুল খোলার লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী : শিক্ষার গেরুয়াকরণ? মনসুন ওয়েডিং: এক পশলা বৃষ্টিতে ধোয়া সম্পর্কের হিসেব অনুদান কোটি কোটি, প্রার্থী মোটে ১৫! গুজরাটের বেনামী দলগুলোর আড়ালে কি বিশাল কর ফাঁকির খেলা?

নকশী কাঁথা: বাঙালি নারীর নীরব প্রতিরোধ ও জীবনের আলেখ্য

১০ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

জসিমউদ্দীন তাঁর ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কাব্যে রূপাই ও সাজুর বিরহগাথাকে এই কাঁথার ক্যানভাসে বেঁধেছিলেন। কিন্তু সাহিত্যের সেই ট্র্যাজেডির আড়ালেও লুকিয়ে ছিল বাংলার আবহমান গ্রামীণ সমাজের সংগ্রাম ও অস্তিত্বের বাস্তবতা।
​‘নকশী কাঁথা’ বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শান্ত গৃহকোণে একদল গ্রামীণ নারীর আড্ডা, পুরোনো শাড়ির পাড় থেকে সংগৃহীত সুতোর আলপনা আর সুচ-সুতোর নিপুণ বুনন। তবে একে কেবল একটি গৃহস্থালি শিল্পকর্ম বা লোকশিল্প হিসেবে চিহ্নিত করলে এর আসল শক্তির অপমান হয়। ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নকশী কাঁথা কোনো সাধারণ হস্তশিল্প নয়; বরং তা বাঙালি নারীর নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক বয়ান, শ্রেণি-সংগ্রাম এবং প্রান্তিক সমাজ-মনস্তত্ত্বের এক প্রাতিষ্ঠানিক দলিল।



​ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি সমাজব্যবস্থায় নারী ছিল পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় শৃঙ্খলিত। অন্দরমহলের চারদেওয়ালের বন্ধনে বন্দি নারীর নিজস্ব রাজনৈতিক বা সামাজিক মতামত প্রকাশের প্রত্যক্ষ সুযোগ ছিল না। এই বন্দিদশায় নকশী কাঁথা হয়ে উঠেছিল তাদের এক গোপন কিন্তু শক্তিশালী আত্মপ্রকাশের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।
​শাড়ির জীর্ণ সুতো দিয়ে সুচের প্রতিটি টানে নারীরা এঁকেছেন তাঁদের আনন্দ, কান্না, অবহেলা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। পদ্ম, বৃক্ষ, পাখি বা জীবনচক্রের রূপকে যে সুচিন্তিত নকশা ফুটে উঠত, তা আসলে পুরুষতান্ত্রিক অনুশাসনের বিরুদ্ধে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ । যে ভাষায় কথা বলা সামাজিক নিয়মে নিষেধ ছিল, সেই ভাষাই স্থান পেত কাঁথার ক্যানভাসে।

নকশীকাঁথা বুনন

​নকশী কাঁথার উৎপত্তি মূলত চরম অভাব এবং উপযোগিতাবাদী চেতনা থেকে। নতুন কাপড়ের অপ্রতুলতা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং পরিবারের অপচয় রোধের তাগিদ থেকেই পুরোনো শাড়ির পুনর্ব্যবহার শুরু হয়। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি ছিল আধুনিক পরিবেশবান্ধব টেকসই শিল্প বা ‘উজান-উৎপাদন’ -এর এক অসামান্য পূর্বাভাস।
​ নকশী কাঁথা পুঁজিতান্ত্রিক বাজারব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। পুঁজিবাদ যেখানে ক্ষণস্থায়ী ভোগবাদ ও গণ-উৎপাদনকে (Mass Production) উৎসাহিত করে, নকশী কাঁথা সেখানে ধরে রাখে ব্যক্তিগত স্পর্শ, শ্রমের মূল্য ও স্থায়িত্ব।
​অবিভক্ত বাংলার নদীমাতৃক পলিমাটিতে নকশী কাঁথার বিকাশ ঘটেছিল। ১৯৪৭-এর দেশভাগ এবং পরবর্তীকালে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তন নকশী কাঁথার বিবর্তনে নতুন মাত্রা যোগ করে। এটি কেবল কোনো একক ধর্মের আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।


​হিন্দু পরিবারের কাঁথায় যেখানে দেখা যেত ‘পদ্ম’, ‘সূর্য’, ‘জীবনবৃক্ষ’ বা ‘শঙ্খ’—যা মহাজাগতিক ভারসাম্য ও প্রজননক্ষমতার প্রতীক; অন্যদিকে মুসলিম পরিবারের কাঁথায় জ্যামিতিক নকশা, ‘চাঁদ-তারা’ বা ‘কলকা’ স্থান পেয়েছিল। তবে ভিন্ন ধর্মীয় মোটিফ থাকা সত্ত্বেও, রচনার কৌশল ও ব্যবহৃত উপাদানে এটি ছিল অখণ্ড বাংলার লোকসংস্কৃতির এক যৌথ সংমিশ্রণ। রাজশাহী, যশোর, জামালপুর কিংবা ময়মনসিংহের সীমান্ত ছাড়িয়ে নকশী কাঁথা প্রমাণ করেছে যে, ভূ-রাজনীতি মানচিত্র বিভাজিত করলেও সংস্কৃতির সূক্ষ্ম সুতোকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।

নকশীকাঁথার নকশা

​বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে নকশী কাঁথার রাজনৈতিক রূপ পরিবর্তিত হয়েছে। যা একসময় ছিল অন্দরমহলের অপেশাদার আবেগ ও শিল্পচর্চা, আজ তা পরিণত হয়েছে বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন হাউজ, বুটিক ও রপ্তানিমুখী বুর্জোয়া বাজারের অতি-লাভে বিক্রি হওয়া পণ্যে।
​এই বাণিজ্যিকীকরণের পেছনে রয়েছে এক করুণ রাজনৈতিক অর্থনীতি। যে প্রান্তিক ও গ্রামীণ নারীরা দিনের পর দিন নিচু আলোয় বসে সুচ ফুটিয়ে চোখ নষ্ট করে এই শিল্প তৈরি করছেন, পুঁজিবাদী বাজারে তাঁরা পাচ্ছেন না তাঁদের উপযুক্ত শ্রমমূল্য। মধ্যস্বত্বভোগী ও বড় শিল্পপতিরা নকশী কাঁথার ঐতিহ্য বিক্রি করে বিপুল মুনাফা অর্জন করলেও, মূল কারিগরদের জীবনযাত্রার মান এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচেই রয়ে গেছে। শিল্প যখন বিলাসবহুল পণ্যে রূপান্তরিত হয়, তখন শ্রমিকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়াটাই বর্তমান ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈষম্য।

​আজকের দিনে দাঁড়িয়ে নকশী কাঁথা কেবল অতিপরিচিত হস্তশিল্পের প্রতীক নয়—এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, লিঙ্গসাম্য অর্জনের নীরব সংগ্রাম এবং প্রান্তিক শ্রমের এক ঐতিহাসিক স্মারক। কাঁথার প্রতিটা ফোঁড় ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়: শিল্প কেবল সৌন্দর্যের উপাসনা নয়, শিল্প হলো মানুষের টিকে থাকার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনীতি।

অন্যান্য প্রতিবেদন.