আগস্টের ভয়াবহ হড়পা বানে বিধ্বস্ত নেপালে এবার নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার দেশটির সুদূরপশ্চিম প্রদেশের ধারচুলা জেলায় আপি হিমল গ্রামীণ পুরসভার ভাট্টারে বিশাল ধস নামে, যার জেরে আংশিকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে যায় চৌলানি (স্থানীয় নামে চামেলিয়া) নদীর গতিপথ। পাহাড়ের একটা বড় অংশ ধসে পাথর, মাটি ও ধ্বংসস্তূপ সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ার দৃশ্য ধারণ করা একটি ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
জেলা প্রশাসনের আশঙ্কা, একই এলাকায় আরও ধস নামলে নদীর গতিপথ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার ফলে হঠাৎ বাঁধ ভেঙে নিম্ন অববাহিকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এই কারণে নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে ও প্রয়োজন ছাড়া নদীর কাছাকাছি এলাকায় না যেতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনিক আধিকারিক বর্তরাজ পৌডেল বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, আর জরুরি পরিস্থিতিতে জাতীয় জরুরি পরিচালন কেন্দ্র, নেপাল পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর হেল্পলাইন নম্বরও প্রকাশ করা হয়েছে।
চৌলানি-চামেলিয়া নদী ব্যবস্থা আপি হিমল অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে শেষে মহাকালী নদীতে গিয়ে মেশে, যা নেপাল-ভারত সীমান্তের একাংশ গঠন করেছে, ফলে ভারতের পিথোরাগড় জেলার নিকটবর্তী এলাকাগুলিও এই পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। নদীর ওপর অবস্থিত চামেলিয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং তার ঊর্ধ্বতে থাকা বালাঞ্চের আরেকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মীরাও উদ্বেগে রয়েছেন। সুদূরপশ্চিমের মুখ্যমন্ত্রী খগরাজ ভট্ট ইতিমধ্যেই বিপর্যয় মোকাবিলার সব রকম প্রস্তুতি সেরে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই সাম্প্রতিক ধস গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বিপর্যয়ের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ঘটনা। সেদিন নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমালয়ের উঁচু অংশে পাথর ও বরফের ধস নেমে ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় প্রবল জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছিল, যাতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। সাম্প্রতিকতম হিসেব অনুযায়ী, সেই বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা এখন ১,৩০০ ছাড়িয়ে গেছে এবং প্রায় ৫,০০০ মানুষ এখনও নিখোঁজ। শুক্রবার রাত পর্যন্ত ১,২৯৫ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে এবং ১২ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হয়েছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিতে এখনও প্রায় ৯০০ শ্রমিকের খোঁজ মেলেনি, যাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা। উদ্ধারকারী দল এখনও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে প্রাণের সন্ধান চালাচ্ছে।
এই বিপর্যয়ের মধ্যেই সম্প্রতি জানা গেছে, ত্রিশূলী ৩এ সুড়ঙ্গে ১০ দিন আটকে থাকা দু’জন শ্রমিককে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।সব মিলিয়ে, একদিকে আগের বিপর্যয়ের ক্ষত এখনও দগদগে, অন্যদিকে ধারচুলার নতুন ধস নেপালের প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
নেপালের এই দুর্যোগের জন্যে নেপাল নিজে দায়ী নয়। প্রত্যেক বছর নেপালের মতো একটি ছোট দেশ থেকে ০.১ শতাংশের চাইতেও কম কার্বন নিঃসরণ হয়। ভারত সেখানে বিশ্বের তৃতীয় কার্বন নিঃসরণকারী দেশ।তাছাড়াও নেপাল প্রধানত জলবিদ্যুতের ওপরেই নির্ভরশীল। ইতিমধ্যেই নেপাল ভারত, আমেরিকা এবং অন্যান্য প্রভাবশালী দেশ থেকে ক্ষতিপূরণও চেয়েছে নেপালকে পুনঃনির্মাণের জন্যে। জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে আসন্ন বিপদাবলীর জন্যে কোন কোন দেশকে কোন যুক্তিতে দায়ী করা হবে এটাই প্রশ্ন। কারণ পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে চলেছে।

