নকশী কাঁথা: বাঙালি নারীর নীরব প্রতিরোধ ও জীবনের আলেখ্য কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের নাগরিকত্ব যাচাই ও হয়রানির সংকট, ভাষার বুলডোজার! বাংলা থেকে আমেরিকান ক্যাপিটালিজম: সিয়ারসাকারের দাসত্ব ও আভিজাত্যের ইতিহাস অবৈধ মাইনিং এবং পরিবেশ উদাসীনতায় ডুবছে আসাম বালাঘাটে শিশুমৃত্যু,স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা ও বৈগা আদিবাসী সংকট এক বছরের মধ্যে, RSS পরিচালিত ১০০০টি স্কুল খোলার লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী : শিক্ষার গেরুয়াকরণ? মনসুন ওয়েডিং: এক পশলা বৃষ্টিতে ধোয়া সম্পর্কের হিসেব অনুদান কোটি কোটি, প্রার্থী মোটে ১৫! গুজরাটের বেনামী দলগুলোর আড়ালে কি বিশাল কর ফাঁকির খেলা?

ত্রিশূলীর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার দুই শ্রমিক, দূর্যোগের ন’দিন পর!

৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

নেপালের ত্রিশূলী থ্রি-এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ পথ যেন আজ কেবল এক পাথুরে গহ্বর নয়, বরং হিমালয়ের কোলে লুকিয়ে থাকা রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থা, উন্নয়নের চকচকে মোড়ক এবং প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক নির্মম ও জীবন্ত রূপক। সুড়ঙ্গের সুগভীর অন্ধকূপ থেকে দীর্ঘ নয় দিন পেরিয়ে দু’জন শ্রমিকের জীবিত উদ্ধার হওয়া এবং একই সঙ্গে সুড়ঙ্গের গাঢ় অন্তস্তল থেকে আরও প্রাণস্পন্দিত স্বরের ভেসে আসা—এই ঘটনাটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, নীতিহীন উন্নয়ন মডেল এবং সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের এক মমার্হ রাজনৈতিক দলিল।


​উন্নয়ন আজ বিশ্বজুড়ে এক আদিম নেশা। ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মোহে রাষ্ট্রগুলো হিমালয়ের মতো সুপ্রাচীন ও সংবেদনশীল ভূপ্রকৃতির বুক চিরে গড়ে তুলছে একের পর এক সুড়ঙ্গ, বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। নেপাল বা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মতো ভূরাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর অঞ্চলে এই মেগা প্রকল্পগুলো প্রায়শই নীতি নির্ধারকদের কাছে কেবল জিডিপি বৃদ্ধির সিঁড়ি বা বৈদেশিক মুদ্রার হাতছানি। কিন্তু এই চকচকে কংক্রিটের আড়ালের পেছনের চিত্রটি বড়ই নির্মম। পুঁজিবাদের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে শ্রমিকেরা যখন সেই অন্তহীন অন্ধকারের গহ্বরে নামেন, তখন তাদের জীবনের নিরাপত্তা বা সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায় যেন কর্পোরেট মুনাফাখোর ও উদাসীন প্রশাসনের থাকে না। ত্রিশূলীর সুড়ঙ্গ দুর্ঘটনা তাই নিছক কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, এটি কাঠামোগত অবহেলা ও জনস্বার্থহীন রাষ্ট্রীয় নীতির অনিবার্য পরিণতি।


​তবে এই অন্ধকারের বুক জুড়েই জ্বলে উঠেছে আশা। দীর্ঘ ন’টি দিন—প্রায় দু’শো ষোলো ঘণ্টা জল, আলো ও অক্সিজেনহীন মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে দু’টি প্রাণ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে জয়ী হয়েছে। রাষ্ট্র যখন ব্যর্থ হয়, নীতি যখন হাত গুটিয়ে নেয়, তখন সাধারণ মানুষের নাড়ির টান এবং শ্রমিকদের অন্তরের বাঁচবার মন্ত্র শেখায় । প্রশ্ন জাগে—কতকাল এই পাহাড়ের বুক চিরে উন্নয়নের নামে মানুষের কঙ্কাল লুকিয়ে রাখা হবে?


​নেপালের রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরেই ক্ষমতা দখল, জোটের মারপ্যাচ এবং বাহ্যিক পরাশক্তির প্রভাববলয়ে আবর্তিত হয়ে আসছে। দিল্লির বা অন্য কোনো শক্তির কূটনীতির বেড়াজালে যখন কাঠমান্ডুর নীতিনির্ধারকেরা ব্যস্ত থাকেন কুর্সি টিকিয়ে রাখার খেলায়, তখন হিমালয়ের পাদদেশের প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবন এভাবেই বিপন্ন হয় সুরঙ্গ বা ধসের অতলে। ত্রিশূলীর এই উদ্ধারকার্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র ব্যবস্থার আসল মাপকাঠি কেবল মেগা প্রজেক্টের ইট-পাথরের বহর নয়, বরং সেখানে কাজ করা সর্বশেষ মানুষটির জীবনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা।


​আজ ত্রিশূলীর জলরাশিতে কেবল পাহাড়ি নদীর কলতান নেই, সেখানে মিশে আছে শ্রমিকের ঘাম, দীর্ঘশ্বাস আর নতুন জীবনের প্রতীক্ষা। সুড়ঙ্গের গভীরে এখনো যেসব স্বর ভেসে আসছে, তা আমাদের কাঠামোগত অন্ধত্বকে চূর্ণ করার এক অবিনাশী আহ্বান। যদি এই ঘটনার পরও রাষ্ট্র তার উন্নয়নের অন্ধ মডেল সংশোধন না করে, তবে আগামী দিনে এই সুড়ঙ্গ পথই হয়ে উঠবে একুশ শতকের রাজনীতির এক গভীরতম কবরস্থান। তাই ত্রিশূলীর উদ্ধার অভিযান কেবল দু’জন মানুষের ঘরে ফেরা নয়, এটি সমস্ত শোষিত ও অবহেলিত প্রাণের পক্ষ থেকে এক নতুন রাজনৈতিক ইশতেহারর।

অন্যান্য প্রতিবেদন.