হরিয়ানার হিসার শহর বর্তমানে এক তীব্র সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাস থেকে শুরু হওয়া সাফাইকর্মীদের অনির্দিষ্টকালের লাগাতার ধর্মঘট এবং সেপ্টেম্বর মাসে তার তীব্রতা এক নতুন মাত্রা নিয়েছে। চুক্তিভিত্তিক শ্রম ব্যবস্থার অবসান এবং স্থায়ী নিয়োগের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন আজ কেবল একটি পৌর সমস্যা বা পরিচ্ছন্নতার সংকটে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি দেশের শ্রম নীতি, প্রশাসনিক একরোখা মনোভাব এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের এক জটিল রাজনৈতিক রূপ ধারণ করেছে।
হিসারসহ সমগ্র হরিয়ানার বিভিন্ন জায়গায় কর্মরত সাফাইকর্মীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হলো এই আন্দোলন। তাদের মূল দাবিগুলি হলো- এক, শ্রমবাজারে লাগাতার শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত ‘ঠিকা প্রথা’ বা ঠিকাদারি প্রথা সম্পূর্ণ বাতিল করা। দুই,বছরের পর বছর ধরে অনিয়মিত ও কম বেতনে কাজ করা অস্থায়ী কর্মীদের অবিলম্বে স্থায়ী করা।তিন, নিয়মিত বেতন প্রদান এবং জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বাড়ানো।এরকম মূলত ১৪ দফা দাবির ভিত্তিতে এই আন্দোলন শুরু হলেও, এর পেছনে রয়েছে রাজ্য সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা। শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সরকার বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষা করেনি। ফলে বাধ্য হয়েই শ্রমিকদের রাজপথে নামতে হয়েছে।

শহরের রাজপথ এবং বাজারগুলোয় আবর্জনার পাহাড় জমে জনস্বাস্থ্য যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন সরকার রাজনৈতিকভাবে সংকট সমাধানের পথ না বেছে প্রশাসনিক দমনপীড়নের পথ বেছে নেয়। আন্দোলন ভাঙতে রাজ্য সরকার এসেনশিয়াল সার্ভিসেস মেইনটেইন্যান্স অ্যাক্ট (ESMA) জারি করে। এই আইনের মাধ্যমে ধর্মঘটকে অবৈধ ঘোষণা করে আন্দোলনরত শ্রমিকদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।প্রশাসন দাবি মেনে নেওয়ার পরিবর্তে ভারী জেসিবি মেশিন এবং ডাম্প ট্রাক নামিয়ে জোরপূর্বক আবর্জনা অপসারণের বিশেষ অভিযান শুরু করে। মধ্যরাতে বা ভোরে পুলিশের বেষ্টনীতে এই কাজ চালানোর ফলে শ্রমিক ও প্রশাসনের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়।হিসারে প্রশাসন ও শ্রমিকদের এই সংঘাত কেবল কর্মবিরতির সীমানা পেরিয়ে প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে।আন্দোলনে নারী সাফাইকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে এবং পুলিশি পদক্ষেপে তাঁদের অনেকেই আহত হয়েছেন।
এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ট্রেড ইউনিয়নের মৌলিক অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পরিসর সংকুচিত হয়ে আসছে। শ্রমিকদের পেটে লাথি মেরে জরুরি পরিষেবার জিগির তুলে আন্দোলন দমন করার এই সংস্কৃতি প্রশাসনিক অসংবেদনশীলতারই প্রমাণ দেয়।
হরিয়ানার মতো রাজ্যে, যেখানে কর্মসংস্থান একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু, সেখানে চুক্তিভিত্তিক শ্রমের বিস্তার রাজনৈতিক দলগুলোর ফাঁপা উন্নয়ন মডেলকে উন্মুক্ত করে দেয়। সরকার ও মন্ত্রীদের সঙ্গে শ্রমিক নেতাদের একাধিক বৈঠক হওয়া সত্ত্বেও কোনো ফলপ্রসূ সমাধান না হওয়া প্রমাণ করে যে, সরকার শ্রমিকদের নায্য দাবিগুলোকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তারা মনে করছে, কঠোর আইন ও পুলিশি বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়া সম্ভব।
হিসারের সাফাইকর্মীদের আন্দোলন আজ হরিয়ানা সরকারের শ্রম নীতির বিরুদ্ধে এক প্রতীকী প্রতিরোধে পরিণত হয়েছে। এসমা (ESMA) জারি করে বা পুলিশি গ্রেপ্তার চালিয়ে সাময়িকভাবে শহরের ময়লা পরিষ্কার করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু মানুষের মনের ক্ষোভ ও অধিকারের দাবিকে দমন করা যায় না।
যতক্ষণ না সরকার ঠিকাদারি প্রথার মতো শোষণমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে আন্তরিক ও অর্থবহ আলোচনায় বসছে, ততক্ষণ এই রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার প্রশমিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

