নকশী কাঁথা: বাঙালি নারীর নীরব প্রতিরোধ ও জীবনের আলেখ্য কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের নাগরিকত্ব যাচাই ও হয়রানির সংকট, ভাষার বুলডোজার! বাংলা থেকে আমেরিকান ক্যাপিটালিজম: সিয়ারসাকারের দাসত্ব ও আভিজাত্যের ইতিহাস অবৈধ মাইনিং এবং পরিবেশ উদাসীনতায় ডুবছে আসাম বালাঘাটে শিশুমৃত্যু,স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা ও বৈগা আদিবাসী সংকট এক বছরের মধ্যে, RSS পরিচালিত ১০০০টি স্কুল খোলার লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী : শিক্ষার গেরুয়াকরণ? মনসুন ওয়েডিং: এক পশলা বৃষ্টিতে ধোয়া সম্পর্কের হিসেব অনুদান কোটি কোটি, প্রার্থী মোটে ১৫! গুজরাটের বেনামী দলগুলোর আড়ালে কি বিশাল কর ফাঁকির খেলা?

যাদবপুরে আক্রমণ নিছক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবধারণাকে ধ্বংস করার সংঘ পরিবারের প্রকল্পের অংশ

৮৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

যাদবপুরে এই আক্রমণ কি প্রথম? শুধুই কি যাদবপুর? দেশের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই কেন দখল করতে উন্মুখ সংঘ পরিবার? মূল প্রশ্নটা এখানেই। রাজ্যে ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে থেকেই যাদবপুর দখলে বারবার ঝাঁপিয়েছে সংঘের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ। তাতে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছে সংঘের রাজনৈতিক মুখ বিজেপি। আর এই ঝাঁপিয়ে পড়া কখনই যে খুব একটা গণতান্ত্রিকভভাবে হয়েছে এরকমটা নয়।


‘যাদবপুর দখল করতে হবে’, এই তাদের ইচ্ছে। এখানে খুব জরুরি ‘দখল’ বিষয়টি। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দখল করতে হবে কেন? নিজেদের সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠন হিসেবে পরিচয় দেওয়া আরএসএস প্রথম থেকেই কাজ করে এসেছে মানুষের চেতনাকে নিজেদের প্রভাব বলয়ের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্যে। তাই নিছক রাজনৈতিক ক্ষমতায় আসীন হয়ে তাদের লক্ষ্য পূরণ হয় না। তাঁরা চায় অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সমস্ত ক্ষেত্রে নিজেদের একাধিপত্য। নির্বাচনের মাধ্যমে দখল না নিতে পারলেও, যেন-তেন প্রকারে বলপ্রয়োগ করে একটি প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের কুক্ষিগত করতে তারা উদগ্রীব। ২০০৪ পরবর্তীতে দেশজুড়ে এই উদাহরণ ভুরি-ভুরি। এই কুক্ষিগত করার প্রক্রিয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে যদি নিজেদের আয়ত্তে না আনা যায়, তাহলে সংঘ পরিবারের উদ্দেশ্য সফল হবে না। চেতনার যে দাসত্ব সংঘ পরিবারের অভীষ্ট, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবধারণা তাদের কাছে অন্যতম প্রতিবন্ধক। জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় হোক অথবা হায়দ্রাবাদ সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি, বিশ্বভারতী হোক বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, তাদের দখল করার প্রচেষ্টা তাই সংঘের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পেরই অংশ।

যাদবপুরের দেওয়ালে ফ্যাসিবাদবিরোধী স্লোগান


আইডিয়া অব ইউনিভার্সিটি কী? এই বিষয়ে জন হেনরি নিউম্যানের তত্ত্বজগৎ নিয়ে যদি আলোচনা নাও করি; তবু আরও সহজ এবং ব্যাপকার্থে এই ধারণা স্পষ্ট হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কলমে। আমাদের পরিচিত কয়েকটি লাইনেই সেই ছবিটা ধরা আছে —“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির/ জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর/ আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী/ বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি”। এই অবধারণার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভিত। গুরুবাদী একমাত্রিকতার বিপ্রতীপে, আদান-প্রদান এবং বহুত্বতার প্রতীক বিশ্ববিদ্যালয় —‘দেবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে’।


এই চেতনার ঠিক বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে আছে সংঘ পরিবার। তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে এই চেতনা অন্যতম প্রতিবন্ধক। তাদের ইচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় হবে হীরক রাজার দেশের সেই মগজধোলাই যন্ত্র। সেখানে হয় তোতাপাখি তৈরি হবে, না-হলে সস্তা মজুর। নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির নীল নকশা এই ভাবনা থেকেই গড়ে উঠেছিল। নিছক সিলেবাস বদল করে, ইতিহাস বিকৃত করে, মোদীর জীবন নির্ভর সিনেমা স্কুলগুলিতে দেখিয়ে, অথবা সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে আরএসএসের লোকদের নিয়োগ করে শিক্ষার গৈরিকীকরণ করা হচ্ছে, শুধুমাত্র সেটাই নয়; শিক্ষার মূল ধাঁচাটাই আমূল বদলে দিতে চায় ওরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল স্বত্বভোগী সেখানকার পড়ুয়ারা। কিন্তু সংঘ পরিবার চায়, সেই স্বত্বের অধিকার পড়ুয়াদের কাছে থাকবে না। পড়ুয়ারা হবে যন্ত্রবৎ। না-হলে তারা ‘হীরকের রাজা ভগবান’ বলবে কেন! সমাজের সর্বস্তরে এই ধারনাকেই গেঁথে দেওয়ার চেষ্টায় সংঘের কোনো খামতি নেই। তাই পড়ুয়াদের বিভিন্ন তকমায় দাগিয়ে দিয়ে জন-মনকে বেঁধে ফেলতে চায় সংঘ পরিবার। কখনও দেশদ্রোহী, কখনও দিমাগী নকশাল, কখনও আন্দোলনজীবী ইত্যাদি বলে পড়ুয়াদের সমকালীন সমাজের চোখে ওপর হিসেবে প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা এই প্রক্রিয়ারই অঙ্গ।


ভারতের মতো বহুত্ববাদী দেশে, এককেন্দ্রিকতার চাষ করার জন্যই চালু করা হয়েছিল কমন ইউনিভার্সিটি এন্ট্রান্স টেস্ট বা সিইউইটি। বিশ্ববিদ্যাল্যগুলির নিজস্ব প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রকিয়াকে শেষ করে দেওয়া হয় এর মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়েই শেষ করার চেষ্টা হয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বাধিকার, স্বায়ত্বতাকে। বহুত্বতার মশাল হয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি জ্বলজ্বল করছিল, যার ছাপ থাকত তাদের প্রবেশিকা পরীক্ষা এবং পাঠক্রমে তাকে অকেজো করে দেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য। আর একথা তো আজ জলের মতো স্পষ্ট, যে সংস্থাটির ওপর এই সমস্ত সর্বভারতীয় পরীক্ষাগুলি পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে মোদী সরকার, সেই ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত একটি সংস্থা। সর্ষের মধ্যেই রয়েছে ভূত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে এবিভিপির তান্ডব


এর সঙ্গে ওদের চাহিদা ইঁদুর দৌড়ে সামিল হয়ে শুধুমাত্র সস্তা মজুর তৈরি হবে এদেশের যুবসমাজ। তাই কারিগরি শিক্ষা বা বৃত্তিমূলক শিক্ষাই হবে মূল লক্ষ্য, গবেষণা বলে কিছু থাকবে না। কারণ গবেষণা করলে, মানুষ স্বাধীনভাবে জানতে, ভাবতে, বলতে, লিখতে শিখবে। সেটা সংঘ পরিবারের চোখের বালি। শিক্ষাকে পণ্য বানানোর উদ্দেশ্য শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের মুনাফার খোলা ময়দান বানানোর জন্য নয়, সংঘ চায় না দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে শিক্ষা সহজলভ্য হোক, কারণ যারা যত বেশি জানে, তত কম মানে। সেই কারণেই সংঘকে ক্ষমতায় রাখায় যেমন কর্পোরেটের লাভ, শিক্ষার ময়দান কর্পোরেটের মুনাফার বাজারে পরিণত হওয়ার রাস্তাটা মাখন হয়ে যায়, তেমনই এর ফলে সংঘেরও লাভ। সেও অধিকাংশ মানুষকে অশিক্ষা-অর্ধশিক্ষা-কুশিক্ষার জাঁতাকলে জড়িয়ে নিতে পারছে। এইভাবেই কর্পোরেট আর সংঘ এক অপরের স্বার্থের পরিপূরক হয়ে উঠছে, একে অপরের লক্ষ্যকে পূরণ করে চলেছে। নয়া জাতীয় শিক্ষা নীতির মূল ভিতটা দাঁড়িয়ে আছে কর্পোরেট এবং সংঘের এই আদান-প্রদানের ওপর।


সংঘ পরিবারের এই প্রকল্পের কাছে দেশের যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এখনও মাথা নোয়ায়নি, ভয়শূন্য চিত্তে মুক্ত জ্ঞানের পতাকা নিয়ে যারা এখনও দাঁড়িয়ে আছে, যাদের মগজে এখনও কার্ফু জারি করতে সক্ষম হয়নি ওরা, সেই মুক্ত পরিসরকে দখল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে তারা। শতবর্ষে এসে নিজেদের প্রকল্প পূরনের যে স্বপ্ন বারংবার প্রতিহত হচ্ছে যেসব দরজায়, সেগুলো ওরা ভাঙতে চাইছে, তাণ্ডবের হুমকি দিচ্ছে। এই প্রসঙ্গেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধি কারী যাদবপুরে ‘বন্দেমাতরম্‌’ গাইতে এসে যা বলেছেন সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যার্থী পরিষদ নাকি জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়-সহ সবাইকে শায়েস্তা করে দিয়েছে। একটি ছাত্র সংগঠন হঠাৎ ‘শায়েস্তা’ করার ঠিকাদারি কেন নিল? একটি রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান সেই ঠিকাদারিকে জায়েজ আখ্যা দিচ্ছেন কী কারণে? প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও জানা।


যাদবপুরের পড়ুয়ারা ‘বেয়াদব’, দিলীপ ঘোষের মতো সংঘের প্রচারক এবং বিজেপির নেতা বহুদিন ধরে এই হুঙ্কার দিয়ে আসছেন। আদতে সংঘ যে ‘আদব’ শেখাতে চায়, তার বিরুদ্ধে মুক্তচিন্তার ‘আদব’ নিয়ে বারবার প্রতিরোধের পাঁচিল গড়েছে যাদবপুরের পড়ুয়ারা। তাই তাদের শায়েস্তা করা দরকার। সেই দায়িত্ব এবিভিপি নামক ঝটিকা বাহিনী নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে। আর দায়িত্ব সহকারে তারা এই আদব শেখানোর চেষ্টা করে চলেছে ভারতের উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে।
তাই যাদবপুরের ঘটনা নিছক প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ নয়, দেশজুড়ে জ্ঞানচর্চার মুক্তাঙ্গনকে দখল করার সংঘ পরিবারের প্রকল্পেরই অংশ। সেই প্রকল্পেরই অংশ ছিল রোহিত ভেমুলার প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা, জেএনইউ-কে দেশদ্রোহী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়কে কার্যত কারাগারে পরিণত করা, বিশ্বভারতীকে প্রাতিস্থানিকভাবে শেষ করা, সাম্প্রতিক নয়া আইএসআই বিল বা যাদবপুরে তাণ্ডব। প্রশাসনিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির কর্তৃপক্ষকে কুক্ষিগত করে, ঝটিকা বাহিনীর মাধ্যমে তাণ্ডব চালিয়ে, পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে গোয়েবলসিয় কায়দায় অপপ্রচার চালিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল অবধারণাকে ধ্বংস করে আদতে অচলায়তন তৈরি করাই সংঘ পরিবারের উদ্দেশ্য। কিন্তু অচলায়তন ভাঙতে পঞ্চকরা সামনে আসবেই, এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

অন্যান্য প্রতিবেদন.