নকশী কাঁথা: বাঙালি নারীর নীরব প্রতিরোধ ও জীবনের আলেখ্য কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের নাগরিকত্ব যাচাই ও হয়রানির সংকট, ভাষার বুলডোজার! বাংলা থেকে আমেরিকান ক্যাপিটালিজম: সিয়ারসাকারের দাসত্ব ও আভিজাত্যের ইতিহাস অবৈধ মাইনিং এবং পরিবেশ উদাসীনতায় ডুবছে আসাম বালাঘাটে শিশুমৃত্যু,স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা ও বৈগা আদিবাসী সংকট এক বছরের মধ্যে, RSS পরিচালিত ১০০০টি স্কুল খোলার লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী : শিক্ষার গেরুয়াকরণ? মনসুন ওয়েডিং: এক পশলা বৃষ্টিতে ধোয়া সম্পর্কের হিসেব অনুদান কোটি কোটি, প্রার্থী মোটে ১৫! গুজরাটের বেনামী দলগুলোর আড়ালে কি বিশাল কর ফাঁকির খেলা?

সত্যজিতের সেলুলয়েডে পথের পাঁচালির বর্ষা: জীবনের সুখ-দুঃখের শাশ্বত দলিল

৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

চলচ্চিত্রের প্রধান দুটি দিক – ইমেজ ও ধ্বনি৷ কাহিনি ও পরিবেশ বর্ণনা, সঙ্গীতের ছন্দ গতি বাদ্যযন্ত্র, আলো-ছায়া, আর সবশেষে সংলাপ- এই সবকিছুই একটি চলচ্চিত্রের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে তাকে করে তোলে অনন্য৷ বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে তেমনই এক অবিসংবাদিত মাইলফলক হলো সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘পথের পাঁচালী’। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাসের এই রূপায়ণ কেবল একটি গ্রামের গল্প নয়, এটি গ্রামীণ বাংলার মাটি, হাওয়া, নদী এবং মানুষের জীবনযাপনের এমন এক দলিল, যা আজও বিশ্ব চলচ্চিত্রের মণিকোঠায় উজ্জ্বল।


​বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বর্ষা যেন এক চিরন্তন বার্তাবাহক, যে আপন ছন্দে নির্ধারণ করেছে অপু-দুর্গা-হরিহর-সর্বজয়ার জীবনপাঁচালির মূল সুর। আর সত্যজিৎ রায় সেলুলয়েডের ফ্রেমে সেই পাঁচালির ছন্দকেই ফুটিয়ে তুলেছেন জীবন্ত রূপক হিসেবে। চলচ্চিত্রে প্রথম বর্ষা নামার দৃশ্যটি কেবল একটি দৃশ্য নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তা এক অনন্য শিল্পমুহূর্ত। গ্রীষ্মের নির্মম দাবদাহ ও খরতাপের অবসান ঘটিয়ে যখন কালো মেঘ দিগন্ত গ্রাস করে, তখন গ্রামবাংলার নদী, জলরাশি, মাঠ-প্রান্তর এবং পশুপাখির প্রাণে সঞ্চারিত হয় এক অবর্ণনীয় শিহরণ ও উল্লাস। রৌদ্রদগ্ধ তপ্ত মাঠ, তেজি গরুর পালের ধুলো ও ওড়ার ছন্দ, আর হঠাৎ ঝেঁপে আসা বৃষ্টির ফোঁটায় শুকনো পাতার মরমর শব্দ—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব দৃশ্যায়ন তৈরি হয়।


​অপু ও দুর্গার কাছে বর্ষা প্রথমে ধরা দেয় বাঁধনহারা আনন্দের বার্তা নিয়ে। প্রথম বর্ষায় ভিজে ওঠার সেই স্থায়িত্বহীন মুহূর্তটি কৈশোরের অপার স্বাধীনতার প্রতীক। কাশফুলের দোলা, মেঘে ঢাকা ধূসর আকাশ আর মুষলধারে বৃষ্টিতে দুই ভাইবোনের দিগ্বিদিক ছুটে বেড়ানোর মধ্যে ছিল না কোনো কৃত্রিমতা; সেখানে কেবল ছিল নির্মল প্রাণের জোয়ার। দুর্গার নাচের মতো সাবলীল উপস্থিতি আর অপুর কৌতূহলী ও বিস্ময়ভরা দৃষ্টি দর্শকের মনে জাগিয়ে তোলে এক সুগভীর নস্টালজিয়া।

পথের পাঁচালির বর্ষার দৃশ্যে অপু- দুর্গা


​সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় এই আনন্দের সুরটিই অতি সূক্ষ্ম শিল্পচেতনায় রূপান্তরিত হয় বিষাদের ছায়ায়। পন্ডিত রবিশঙ্করের সরোদের মূর্ছনা আমাদের নিভৃতে বুঝিয়ে দেয়, এই বর্ষার গভীরে লুকিয়ে আছে আসন্ন বিপন্নতার করুণ আভাস। কালবৈশাখীর তাণ্ডব ও অবিরাম বর্ষণ গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের সেই ভাঙা কুটির, ছাদ চুইয়ে পড়া বৃষ্টির জল, নুন আনতে পান্তা ফুরানোর হাহাকার আর ব্যর্থ চিকিৎসাকে আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করায় বাংলার প্রাচীন অথচ চিরকালীন নির্মম দারিদ্র্যের সামনে। প্রকৃতির রোষানলে পড়ে মানুষ আজও যে কতখানি অসহায়, বর্ষা যেন তখনই হয়ে ওঠে তাদের কাছে এক নীরব ‘শমন’!


​যে বৃষ্টি একসময় অপু-দুর্গার কাছে ছিল মুক্তির আনন্দ, সেই বর্ষারই একটি অভিশপ্ত রাতে দীর্ঘক্ষণ ভিজে এবং ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়ে দুর্গার কিশোরী জীবনে নেমে আসে অকালমৃত্যুর ঘনায়মান অন্ধকার। দুর্গার অসুস্থতা ও চিরবিদায়ের দৃশ্যে পরিচালক কোনো মেলোড্রামার আশ্রয় নেননি। অবিরাম বৃষ্টির একটানা রিমঝিম শব্দ, ঝোড়ো হাওয়ার সাঁ সাঁ আওয়াজ এবং হরিহরের অনুপস্থিতিতে সর্বজয়ার বুকফাটা নিঃসঙ্গ আর্তনাদ—সব মিলিয়ে বর্ষা হয়ে ওঠে এক মহাশোকের আবহ। প্রকৃতির সেই অবিশ্রান্ত বারিধারা যেন ধুয়ে দিতে চায় সমস্ত জগত্সংসারের কষ্ট, অথচ দর্শকের মনে রেখে যায় এক গভীর, নিরাময়হীন ক্ষত।


​দুর্গার মৃত্যুর পর দূরদেশ থেকে হরিহর যখন সর্বস্বান্ত পরিবারের কোলে ফিরে আসে, তখনও বাইরে অবিরাম বর্ষাকাল। আকাশ তখনও জমাট কালো মেঘে আচ্ছন্ন। হরিহরের বহু আশার বুকভাঙ্গা প্রলোভনের পাশে তখন চারপাশের প্রকৃতি অদ্ভুত এক স্তব্ধতায় শান্ত হয়ে আসে; আর তাদের শূন্য কোল ছাপিয়ে নামে মহাশূন্যতা।


​সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’তে বর্ষাকাল কেবল আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়; এটি মানবজীবনের সুখ, দুঃখ, প্রাপ্তি-অপরা প্রাপ্তি এবং অন্তিম সত্যের এক অনিবার্য রূপক। বিভূতিভূষণের অন্তর্মুখী সাহিত্যিক অনুভূতির সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের ঋদ্ধ দৃষ্টির এই অপূর্ব মেলবন্ধন বর্ষাকে দান করেছে মহাকাব্যিক উচ্চতা। অপু ও দুর্গার কৈশোরের প্রাণখোলা হাসি থেকে শুরু করে দুর্গার আকস্মিক মৃত্যু এবং হরিহরের সর্বস্বান্ত হয়ে ঘরে ফেরার দীর্ঘশ্বাস—প্রতিটি অনুভূতির সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার মাটিভেজা সোঁদা গন্ধ আর বৃষ্টির অন্তহীন সুর।

অন্যান্য প্রতিবেদন.