খুবই প্রচলিত একটি কথা রয়েছে ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। পুজো আর উৎসব তাই দুটি ভিন্ন বিষয় । বাঙালির শারদোৎসব দুর্গাপুজো কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়। এটি বাঙালির ঐতিহ্য, শিল্প, ঐক্য, ব্যবসা, এমনকি সাহিত্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে। দুর্গাপুজো বিশ্বের এমন একটি উৎসব যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সাহিত্য। সেই সাহিত্য যা যুগ যুগ ধরে ধর্মীয় গোঁড়ামো, জাত-পাত, ভাগাভাগি থেকে মানুষকে উদার করতে শিখিয়ে আসছে। আজও বাঙালির কাছে পুজো মানেই পূজা বার্ষিকী।
একটি সংবাদপত্রের সমীক্ষা অনুযায়ী, শুধু দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বে বাংলা ভাষায় ম্যাগাজিন ফরম্যাটে বা ই-ফরম্যাটে প্রকাশিত পত্রপত্রিকার সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। অর্থাৎ আজও বিশ্বের দরবারে বাঙালির কদর তার সৃজনশীলতার জন্যই। কোনও উৎসবকে কেন্দ্র করে সাহিত্যের এহেন উদযাপন বিভাজিত দুই বঙ্গদেশ বাদে আর কোনও প্রদেশে নেই বললেই চলে৷ এই ইতিহাস অনেক পুরনো।

পুজোর ছুটি কেবল অবসরে কাটবে? তা কী করে হয়? সেই মতোই বাংলার প্রথম পুজো সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১২৮০ সনের আশ্বিন মাসে। কেশব সেনের ভারত সভার সপ্তাহিক পত্রিকা সুলভ সমাচারের একটি সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত হয় ‘ছুটির সুলভ’। মাত্র ১পয়সার এই পত্রিকার জন্য দেওয়া হয়েছিল বিজ্ঞাপনও। সংখ্যা বের হওয়ার ঠিক আগের সপ্তাহে বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল, “আগামী বৃহস্পতিবার ছুটির সুলভ বাহির হইবে। কেমন সুন্দর কাগজ, কেমন পরিষ্কার ছাপা, কেমন মজার ছবি, অথচ সস্তা দাম। ছেলে, বুড়ো, যুবা সকলেই মজা করিয়া ছুটির সুলভ পড়ো। দেখ যেন কেউ ফাঁকি পড়ো না। …কত মজার মজার কথা।” সেই বইয়ে ঠাঁসা ছিল গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা।

তার পর থেকে ‘সাধনা’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘বঙ্গবাণী’, ‘আনন্দবাজার’ প্রভৃতি পত্রিকা পুজো সংখ্যা প্রকাশ শুরু করে। সেসব সংখ্যায় লিখতেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় প্রমুখরা। এরপর এই অভূতপূর্ব সৃষ্টির সঙ্গে জুড়ে যান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ ১২৯৯ সালে সাধনা পত্রিকার ভাদ্র-আশ্বিন যুগ্ম সংখ্যা শারদ সংখ্যা হিসেবেই প্রচারিত হয়েছিল। যা আজও সেরা শারদ সংখ্যাগুলির মধ্যে একটি ধরা হয়। পত্রিকায় গল্পের লেখক ছিলেন স্বয়ং রবি ঠাকুর৷ ১৩২৫ সালে জামাই এর সম্পাদনায় পার্বতী’ পত্রিকায় সম্ভবত প্রথম পুজোর গান ‘শরতে আজ কোন অতিথি এল প্রাণের দ্বারে…’- লেখেন রবি ঠাকুর৷ এরপর ইংরেজি ১৯২৬ সালে প্রথম শারদীয় সংখ্যা বের করে আনন্দবাজার পত্রিকা। কিছুবছর পর প্রথম উপন্যাস ছাপা হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শহরতলী’ , রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত বড় গল্প ‘রবিবার’। এরপর কালের তালে কিশোর ভারতী, শুকতারা, সন্দেশ, দেশ থেকে হালফিলের উনিশ কুড়ি, সানন্দা। পুজো সংখ্যার খোলস বদলেছে, বিষয়, রঙ, ধাঁচ বদলেছে। কল্প বিজ্ঞান থেকে ট্রাভেলগ, ফ্যাশন থেকে কবিতা উপন্যাস সময় আর ট্রেন্ডের দলিল এই পূজা বার্ষিকী। তাই আজও পেপার কাকুর হাত ধরে বাড়িতে পুজো বার্ষিকী না এলে মনেই হয় না পুজো এল। সময়ের নিয়মে এর বিক্রি কমতে পারে কিন্তু সংস্কৃতি মনস্ক বাঙালির পুজো সংখ্যার বিকল্প কোনওকালেই রিল বা পডকাস্ট হতে পারে না।

